প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে পূর্ব রেলওয়ের শিয়ালদহ, হাওড়া, মালদা এবং আসানসোল ডিভিশনের প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম। কাজের সূত্রে হোক বা ব্যবসার খাতিরে, পশ্চিমবঙ্গের আপামর সাধারণ মানুষের কাছে লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন এবং রেল স্টেশনগুলি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়। দীর্ঘক্ষণ ট্রেনে কাটানো কিংবা প্রতিদিন একই সহযাত্রীদের সাথে চেনা ছকে পথ চলার কারণে এই রেল সফর বহু মানুষের কাছে এক ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হয়ে উঠেছে। যেখানে প্রতিদিনের ক্লান্তিকর যাত্রাগুলিও এক অদ্ভুত স্মৃতিতে পরিণত হয় এবং সহযাত্রীরা হয়ে ওঠেন এক অলিখিত পরিবারের অংশ। আমজনতার এই আবেগকে সম্মান জানিয়ে এবং যাত্রী পরিষেবার মানকে এক ধাক্কায় বিশ্বমানের করে তুলতে এবার এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিল পূর্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে, ২০২৬ পর্যন্ত চলা মাসব্যাপী ‘স্বচ্ছতা সচেতনতা অভিযান’-এর বিপুল সাফল্যের পর এবার এই পরিচ্ছন্নতা পরিকাঠামোকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্বের সফল সমাপনীর পর ১৬ মে থেকে আগামী ৩০ মে, ২০২৬ পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে শুরু হচ্ছে এই অভিযানের অত্যন্ত হাইভোল্টেজ দ্বিতীয় পর্যায় (Phase 2)। রেলওয়ের ইতিহাসে এই বিশেষ এবং আধুনিক ডিজিটাল উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘র্যাপিড-রেসপন্স চ্যালেঞ্জ’। প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মে পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার দ্রুত ও বাস্তব সময়ে (Real-Time) সমাধান নিশ্চিত করাই এই চ্যালেঞ্জের মূল লক্ষ্য। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই গোটা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যাত্রীদের সরাসরি সক্রিয় অংশ করে তোলা হচ্ছে।
এই নয়া ‘র্যাপিড-রেসপন্স চ্যালেঞ্জ’-এর নিয়মানুযায়ী, রেলের সফর চলাকালীন কোনো যাত্রী যদি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, ওভারব্রিজ বা রেল প্রাঙ্গণে কোনো রকম অস্বাস্থ্যকর বা নোংরা আবর্জনা স্তূপীকৃত অবস্থায় দেখতে পান, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্মার্টফোনে তার একটি ছবি তুলে নিতে পারবেন। এরপর ছবি সহ সেই অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে ডিভিশন—শিয়ালদহ, হাওড়া, মালদা বা আসানসোল—ট্যাগ করে পূর্ব রেলওয়ের অফিসিয়াল ‘X’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল (@drmhowrah, @drmsdah, @drmmalda, @DrmAsansol)-এ পোস্ট করে দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিযোগ পোস্ট করার সময় যাত্রীদের আবশ্যিকভাবে ব্যবহার করতে হবে একটি নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ, যা হলো #ERChallenge।
পূর্ব রেলওয়ের এই ডিজিটাল ওয়াররুমের তৎপরতা এতটাই কড়া করা হয়েছে যে, যাত্রীদের কাছ থেকে নোংরা আবর্জনার ছবি সহ অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ঠিক ৩০ মিনিটের মধ্যে সেই নির্দিষ্ট স্থানে সাফাই কর্মী পাঠিয়ে সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করার এক রেকর্ড ভাঙা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ, মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে আপনার করা কমপ্লেনের ওপর স্পট অ্যাকশন নেবে রেলের ফ্লাইং স্কোয়াড। শুধু ‘X’ হ্যান্ডেলই নয়, যাত্রীদের সুবিধার্থে কেন্দ্রের জনপ্রিয় ‘রেল মদদ’ (RailMadad) মোবাইল অ্যাপ এবং পূর্ব রেলওয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও সরাসরি এই সমস্ত অভিযোগ নথিভুক্ত করা যাবে।
এই মেগা প্রজেক্ট প্রসঙ্গে পূর্ব রেলওয়ের মাননীয় জেনারেল ম্যানেজার (GM) শ্রী মিলিন্দ দেওস্কর জানিয়েছেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মীবাহিনীর সমন্বয়ে স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুরধার ও কার্যকর করা হচ্ছে। তাঁর মতে, মূল লক্ষ্য হলো যাত্রীদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বাস্তব সময়েই উন্নত করা এবং রেল স্টেশনগুলিকে যাত্রীদের জন্য সত্যিকারের একটি স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হিসেবে গড়ে তোলা। এই কাজ সফল করতে শিয়ালদহ, হাওড়া, মালদা এবং আসানসোল—চারটি ডিভিশনের সমস্ত রেল আধিকারিক ও কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক মোডে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পূর্ব রেলের প্রধান জনসংযোগ আধিকারিক (CPRO) শ্রী শিবরাম মাঝি সাধারণ যাত্রীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ছাড়া এই বিশাল পরিচ্ছন্নতার লড়াই কখনই সফল করা সম্ভব নয়। তিনি সকলকে আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছেন যেন রেল প্রাঙ্গণকে সবাই নিজের বাড়ির মতো পরিষ্কার রাখেন এবং অন্যদেরও যত্রতত্র নোংরা ফেলা থেকে বিরত থাকতে সচেতন করেন। এর পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষ কড়া সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে যে, রেল প্রাঙ্গণে থুতু ফেলা, প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলা একটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভারতীয় রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, এ ধরনের নোংরা ছড়ানোর ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়লে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত স্পট ফাইন বা জরিমানা হতে পারে। তাই এবার নোংরা দেখলেই ছবি তুলুন আর রেলকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করুন।





