আজ কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড সাক্ষী থাকল এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের। লক্ষ লক্ষ মানুষের গগনভেদী চিৎকারের মধ্যে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সাধারণ প্রথা ভেঙে রাজভবনের বদলে ব্রিগেড ময়দানকে শপথের মঞ্চ হিসেবে বেছে নেওয়া রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির বার্তা দিচ্ছে। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে শুরু হলো বাংলার এক নতুন অধ্যায়।
এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে ফিরে দেখা প্রয়োজন স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার শাসনভার কাদের হাতে ছিল। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকাটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত বর্ণময়।
স্বাধীন বাংলার আদি যুগ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের উত্তাল সময়ে বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁর মেয়াদ ছিল অত্যন্ত অল্প। এরপর ১৯৪৮ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়। তাঁকেই বলা হয় ‘আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার’। দুর্গাপুর, সল্টলেক এবং কল্যাণীর মতো উপনগরী গড়ে তোলা থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পায়নের ভিত্তি তিনিই স্থাপন করেছিলেন। টানা ১৪ বছর তিনি দক্ষতার সাথে রাজ্য শাসন করেন। তাঁর প্রয়াণের পর ১৯৬২ সালে প্রফুল্লচন্দ্র সেন দায়িত্ব নিলেও কংগ্রেসের সেই দাপট ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
অস্থিরতা ও যুক্তফ্রন্ট
ষাটের দশকের শেষের দিকে বাংলার রাজনীতিতে এক অস্থির পর্যায় শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে প্রথমবার কংগ্রেসের একাধিপত্য ভেঙে ক্ষমতায় আসে ‘যুক্তফ্রন্ট’ সরকার। বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায় এই টালমাটাল সময়ে তিনবার মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন। সেই সময়ে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি শাসনও জারি করা হয়েছিল। এরপর ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস বিপুলভাবে ক্ষমতায় ফেরে। তাঁর শাসনকাল ছিল চরম নকশাল আন্দোলন ও জরুরি অবস্থার উত্তেজনায় ঘেরা।
৩৪ বছরের বাম শাসন ও পরিবর্তনের রাজনীতি
১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্টের উত্থান ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক ইতিহাস তৈরি করে। টানা ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রী থেকে জ্যোতি বসু রেকর্ড গড়েন। এরপর ২০০০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর উত্তরসূরি হন। কিন্তু সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন বাম শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। যার ফলে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে আসে ঐতিহাসিক ‘পরিবর্তন’। ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজত্ব করেন। কন্যাশ্রী থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প জনপ্রিয় হলেও, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া এবং নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে নানা বিতর্কে তাঁর শাসনামল শেষের দিকে নড়বড়ে হয়ে যায়।
২০২৬: বিজেপির প্রথম সূর্যোদয়
আর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ ২০২৬ সালে বাংলার মসনদে বসল বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একসময় তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন, আজ তিনিই সেই দলের পতন ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। প্রফুল্ল ঘোষ থেকে শুরু করে বিধান রায়, জ্যোতি বসু বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি হিসেবে শুভেন্দুর এই জয় বাংলার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এখন দেখার, প্রগতির পথে বাংলাকে তিনি কতটা উঁচুতে নিয়ে যেতে পারেন।





