বীরভূমে তৃণমূলের ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ যুগের অবসান! কেষ্ট-কাজলদের নিরাপত্তার বহর ছাঁটল নতুন সরকার

বীরভূমের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটাল নতুন সরকার। গত ১৫ বছর ধরে যে দাপুটে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলাফেরা করতেন জেলার তৃণমূল নেতৃত্ব, তা এবার বড়সড় ছাঁটাই করল প্রশাসন। সূত্রের খবর, অনুব্রত মণ্ডল, কাজল শেখ, চন্দ্রনাথ সিনহা এবং আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রভাবশালী নেতাদের ‘ওয়াই’ (Y) ও ‘ওয়াই প্লাস’ (Y+) ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, বীরভূমের তৃণমূল নেতা-মন্ত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের সংখ্যা দিয়ে অনায়াসেই কমপক্ষে দুটি থানা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল।

দীর্ঘদিন ধরে বীরভূম জেলা ছিল অনুব্রত মণ্ডলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য। রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল তাঁর নিরাপত্তার বহর। ওয়াই প্লাস ক্যাটাগরিতে তাঁর কনভয়ে পাইলট কারসহ ১০ জন সশস্ত্র পুলিশকর্মী থাকতেন। এমনকি তিহার জেল থেকে ফেরার পরেও তাঁর নিরাপত্তার কড়াকড়ি বিন্দুমাত্র কমেনি। শুধু অনুব্রতই নন, জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যেত। কিন্তু পালাবদলের পর সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেল। বীরভূম জেলা পুলিশ সুপার সূর্যপ্রতাপ যাদব জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশিকা মেনেই এই নিরাপত্তা কমানো হয়েছে।

বর্তমান নির্দেশে অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা কমিয়ে মাত্র দুজনে নামিয়ে আনা হয়েছে। জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও হাঁসনের বিধায়ক কাজল শেখের নিরাপত্তার দায়িত্বে এখন থাকবেন চারজন। রাজ্যের প্রাক্তন কারামন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা এবং প্রাক্তন বিধানসভার উপাধ্যক্ষ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়ও প্রত্যাহার করা হয়েছে; তাঁদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র একজন করে দেহরক্ষী। একইভাবে, জেলার জয়ী তৃণমূল বিধায়কদেরও নিরাপত্তা কমিয়ে একজন করে দেহরক্ষীতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে নির্বাচনে পরাজিত তৃণমূল প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। লাভপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অভিজিৎ সিংহসহ পরাজিত সব প্রার্থীর নিরাপত্তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের অন্দরের খবর, গত এক দশকে নিয়মের বাইরে গিয়ে তৃণমূলের ব্লক সভাপতি এমনকি অঞ্চল সভাপতিদেরও এক থেকে দুজন করে দেহরক্ষী দেওয়া হতো, যা এবার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই নিরাপত্তার বহর ছিল সংশ্লিষ্ট নেতার রাজনৈতিক ‘ওয়েট’ বা গুরুত্বের মাপকাঠি। পুলিশ মহলের একাংশের অভিযোগ, অনুব্রত মণ্ডলের মতো নেতারা নিজেদের ক্ষমতার জোরে ক্যাটাগরি নির্ধারিত নিরাপত্তার চেয়ে অনেক বেশি পুলিশকর্মীকে কনভয়ে ব্যবহার করতেন। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সেই পুলিশি বেষ্টনী অতীত হয়ে গেল। অনুব্রত-কাজলদের চারপাশের সেই চেনা পুলিশি ভিড় আর দেখা যাবে না। রাজনীতির কারবারিদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জেলায় ক্ষমতার সমীকরণ যে আমূল বদলে গেল, তা বলাই বাহুল্য।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy