২০২৬-এর ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আইনি গেরোয় উত্তপ্ত বাংলার রাজনীতি। ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা’ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ২৭ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে সুপ্রিম কোর্টে। আর এই মামলার গতিপ্রকৃতি যা, তাতে রাজ্যের অন্তত ২৫টি আসনে ফলাফল পাল্টে যাওয়ার বা পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। খোদ সুপ্রিম কোর্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অযোগ্য ঘোষিত ভোটারের সংখ্যা বেশি হয়, তবে সেই আসনগুলির ফলাফল পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের ঠিক আগে অগণতান্ত্রিকভাবে ৩৪ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। যদিও কমিশন ২৭ লক্ষ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করে। এখন দেখা যাচ্ছে, অন্তত ২৫টি এমন আসন রয়েছে যেখানে বিজেপি বা তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি।
ভবানীপুর থেকে চম্পদানি—নজরে হাইপ্রোফাইল আসন:
সবচেয়ে চর্চিত মামলাটি ভবানীপুর আসন নিয়ে। সেখানে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রায় ১৫,০০০ ভোটে পরাজিত করেছেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই আসনে এসআইআর-এর অধীনে ২৮,০০০ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, এবং আরও ১৪,১৫৪ জনের নাম এখনও অমীমাংসিত। অর্থাৎ, বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের প্রায় দ্বিগুণ!
একই চিত্র চম্পদানিতেও। সেখানে বিজেপির দিলীপ সিং ৩,০২৬ ভোটে জিতলেও অযোগ্য ঘোষিত ভোটের সংখ্যা ৭,৬০০-র বেশি। করনদিঘিতে বিজেপির বিরাজ বিশ্বাস ১৯,৮৬৯ ভোটে জিতলেও সেখানে ৩১,৫৬২ জন ভোটারকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। জঙ্গিপুর, মন্তেশ্বর, হেমতাবাদ এবং বালির মতো আসনগুলোতেও একই পাটিগণিত কাজ করছে—যেখানে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের পাল্লা ভারী।
জেলায় জেলায় ভোটের হিসাব:
মুর্শিদাবাদে পরিস্থিতি আরও জটিল। এখানে এসআইআর-এর কোপে ৪ লক্ষেরও বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। ফলস্বরূপ, ২০২১ সালে যে জেলায় তৃণমূল ১৯টি আসন জিতেছিল, এবার সেখানে তারা মাত্র ৯টি আসন পেয়েছে। উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা ছাড়া রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই বিজেপি অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে, যার নেপথ্যে এই ‘ভোটার ছাঁটাই’ প্রক্রিয়ার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ:
গত ২৩ এপ্রিল শুনানির সময় বিচারপতি জে. বাগচি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি কোনও আসনে জয়ের ব্যবধান হয় ২ শতাংশ, কিন্তু ১৫ শতাংশ মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া না হয়, তবে সেই ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা কোথায়?” শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণই এখন জয়ী প্রার্থীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। যদি আদালত এই আসনগুলিতে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেয়, তবে বাংলার রাজনীতির মানচিত্র আবারও বদলে যেতে পারে। এখন সবার নজর পরবর্তী শুনানির দিকে।





