পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়া বইতেই পাল্টে গিয়েছে প্রশাসনিক মেজাজ। দীর্ঘদিনের ‘দাদাগিরি’ আর ‘পুলিশকে শাসানো’র সংস্কৃতিতে এবার দাঁড়ি টানতে শুরু করেছে প্রশাসন। গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশকে মারধর, খুনের চেষ্টা এবং বন্দুক উঁচিয়ে হুমকির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের চার হেভিওয়েট নেতাকে। প্রশাসনিক এই সক্রিয়তা দেখে রাজনৈতিক মহলের মত, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিতে শুরু করেছে পুলিশ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে হুগলির শ্রীরামপুরে। সেখানকার একটি তালাবন্ধ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র (ICDS) দখলকে কেন্দ্র করে অশান্তি চরমে ওঠে। অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে শ্রীরামপুর থানার এএসআই (ASI) নটরাজ সিংহ রায়ের ওপর সপার্ষদ চড়াও হন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর রাজেশ শাহ। খোদ পুলিশ অফিসারের নাকে ঘুষি মেরে তা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে পুলিশ তৎক্ষণাৎ রাজেশ শাহ এবং তাঁর দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে। শ্রীরামপুরের নবনির্বাচিত বিজেপি প্রার্থী ভাস্কর ভট্টাচার্য এই নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেন, “সরকার বদলেছে, প্রশাসন এখন স্বাধীন। পুলিশের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস একমাত্র তৃণমূলেরই হতে পারে, তবে এবার তাদের দিন শেষ।”
গ্রেফতার হওয়ার পর কাউন্সিলর রাজেশ শাহর গলায় অবশ্য কিছুটা সুর নরম এবং সাফাইয়ের সুর শোনা গিয়েছে। তিনি বলেন, “বিল্ডিংটা পাড়ায় সমাধানে করা হয়েছিল। সেটা বিজেপি দখল করায় আমি আপত্তি করতে গিয়েছিলাম। রাজনৈতিক পরিবর্তনে এখন যা হয় আর কী…”
অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পরিস্থিতিও উত্তপ্ত। গোসাবায় খোদ নিজের দলেরই এক কর্মীকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি পরিতোষ হালদারকে। আবার ক্যানিং পশ্চিম বিধানসভা এলাকায় বিজেপি সমর্থকদের বন্দুক দেখিয়ে ভয় দেখানো এবং সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে এক তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীকে। উত্তরবঙ্গ থেকেও একই ধরনের গ্রেফতারির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চারজন প্রভাবশালী নেতার হাজতবাসে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, এবার আর ‘দলের রঙ’ দেখে ছাড় দেবে না প্রশাসন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এলাকাকে দুষ্কৃতীমুক্ত করতে পুলিশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার যে বার্তা নতুন সরকার দিয়েছিল, তার প্রতিফলন এখন সর্বত্র।





