কলকাতার ঐতিহ্যে ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসতে চলেছে এক বড়সড় পরিবর্তন। ২০২৬ সালের বকরি ইদ সাক্ষী হতে চলেছে এক ঐতিহাসিক রদবদলের। দীর্ঘদিনের চেনা রেওয়াজ ভেঙে রেড রোডের পরিবর্তে এবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত হতে চলেছে ইদের মেগা নমাজ পাঠ। কৌশলগত নিরাপত্তা এবং সেনাবাহিনীর বিশেষ আপত্তির জেরেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই বিকল্প স্থানের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তৃণমূল জমানায় রেড রোডের এই নমাজ পাঠ এবং সেখানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি প্রতি বছরই রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম চর্চার বিষয় ছিল। নতুন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বঙ্গ রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিল। ফোর্ট উইলিয়াম ও রাজ্য প্রশাসনের যৌথ পর্যালোচনার পরেই রেড রোডের বিকল্প হিসেবে ব্রিগেডকেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে রেড রোডের এই ধর্মীয় সমাবেশ এক ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছিল। ইদের সকালে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মঞ্চে উপস্থিতি এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া একটি অলিখিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। যদিও রাজ্যের দুই প্রাক্তন বাম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কখনও ইদের নমাজের মঞ্চে রাজনৈতিকভাবে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। নতুন সরকারের আমলে সেই চেনা রাজনৈতিক সমীকরণ একঝটকায় বদলে গেল।
প্রশাসন ও সেনা সূত্রে খবর, রেড রোডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। সামরিক কুচকাওয়াজ ছাড়া সেখানে অন্য কোনো বড় ধর্মীয় বা সামাজিক জমায়েতের অনুমতি পাওয়া প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত জটিল। সেনা সূত্রের দাবি, গত বছরই নমাজের প্রধান আয়োজক সংস্থা ‘খিলাফত কমিটি’-কে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে, নিরাপত্তার স্বার্থে রেড রোডে আর নমাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। সেই সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে দরবার করায় সেবার ‘শেষবারের মতো’ ছাড়পত্র মিলেছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর নিয়ম অনুযায়ী রেড রোডে এই জমায়েত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রকাশ্য রাস্তায় যান চলাচল আটকে নমাজ পাঠ আগেই বন্ধ করেছে নতুন প্রশাসন। তবে ভারতীয় সংবিধান নাগরিকের ধর্মাচরণের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়, তাই খিলাফত কমিটির বিশাল জমায়েতের কথা মাথায় রেখে সরকার বিকল্প ও নিরাপদ জায়গা হিসেবে ব্রিগেডকে বেছে নিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ—দুই দিক খতিয়ে দেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, এই ব্রিগেডের মাঠেই আয়োজিত হয়েছিল ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ’। এবার সেই মাঠেই বকরি ইদের নমাজ আয়োজিত হতে চলেছে, যা কলকাতার ইতিহাসে এই প্রথম। সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখতেই নবান্ন এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।





