চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ মুছে দিয়ে পিতৃত্বের স্বাদ পেতে চলেছেন এমন পুরুষেরা, যাদের একসময় চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তাদের শরীরে কোনো কার্যকর শুক্রাণু নেই। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব জয়জয়কার শুধু বিজ্ঞানীদেরই নয়, বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি নিঃসন্তান দম্পতির মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে।
এই রূপকথার মতো বাস্তব গল্পের নায়ক-নায়িকা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির দম্পতি পেনেলোপ এবং স্যামুয়েল। প্রায় আড়াই বছরের এক দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার অবসান ঘটে গত নভেম্বরে। পেনেলোপ যখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলেন, তখনই তাঁর ফোনে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত কলটি। ওপাশ থেকে চিকিৎসক যখন নিশ্চিত করলেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা, তখন যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না পেনেলোপ। অথচ কয়েক বছর আগেও এই খবরটি পাওয়া ছিল তাঁদের কাছে ছিল এক প্রকার অসম্ভব।
ঘটনার নেপথ্যে ছিল এক কঠিন লড়াই। স্যামুয়েল ‘ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম’ নামক একটি বিরল জিনগত সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। এই সমস্যায় পুরুষরা একটি অতিরিক্ত ‘এক্স’ (X) ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মায়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে ধরাও পড়ে না। এই সিনড্রোমের কারণে স্যামুয়েলের শরীরে তৈরি হয়েছিল ‘অ্যাজোস্পার্মিয়া’—এমন এক অবস্থা যেখানে বীর্যে শুক্রাণুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ বন্ধ্যা পুরুষ এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। বহু বিশেষজ্ঞ তাঁদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, জৈবিকভাবে সন্তান লাভ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। পেনেলোপ ও স্যামুয়েলের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রযুক্তির হাত ধরে, যার নাম ‘স্টার’ (STAR – Sperm Track and Recovery) সিস্টেম। এটি একটি এআই-নির্ভর বিশেষ সফটওয়্যার যা মাইক্রোস্কোপের নিচে হাজার হাজার কোষের মধ্য থেকে অতি ক্ষুদ্র এবং সচল শুক্রাণু কোষগুলি শনাক্ত করতে সক্ষম। মানুষের চোখের পক্ষে যা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল, এআই তা নিখুঁতভাবে করে দেখিয়েছে। স্যামুয়েলের শরীর থেকে সংগৃহীত কোষের মধ্যে থেকে মাত্র একটি কার্যকর ভ্রূণ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। আর সেই একটিমাত্র শেষ সুযোগই সফল হয়েছে।
পেনেলোপ বলেন, “স্যামুয়েল যখন বাড়ি ফিরল এবং আমি খবরটি ওকে দিলাম, ওর চোখের জল বাঁধ মানছিল না। আমাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, কান্না আর গবেষণার পর এই জয় এসেছে।” এই প্রযুক্তি এখন বিশ্বের সেই সমস্ত পুরুষদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে যারা বন্ধ্যাত্বের কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ‘স্টার’ সিস্টেম প্রমাণ করে দিল, যেখানে মানুষের সীমাবদ্ধতা শেষ হয়, সেখান থেকেই এআই-এর নতুন দিগন্ত শুরু হয়।





