আকাশ মেঘে ছেয়ে গেলেই কি আপনার মনের ভিতরটাও এক অজানা ব্যথায় মুচড়ে ওঠে? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না ঠিক কী করলে মন ভালো লাগবে? মনোবিদ ডা. অনিরুদ্ধ দেব বলছেন, ‘‘এ তথ্য ঠিক যে কিছু কিছু মনোরোগ ঋতুভেদে বাড়ে-কমে। ডায়াগনোসিস হিসেবেও তা স্বীকৃত। যেমন ধরুন, উত্তর গোলার্ধে যাঁরা মেরুবৃত্তের কাছাকাছি অঞ্চলে থাকেন এবং ছ’মাস সূর্যের মুখ দেখতে পান না, তাঁদের এক ধরনের মনোরোগ হয় যাকে আমরা সিজ়নাল এফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বলি। এই রোগ একেবারে সরাসরি সূর্যালোকের সঙ্গে যুক্ত, দিনের পর দিন সূর্যের আলো দেখতে না পেলে এই ধরনের সমস্যা হতে পারে। এর চিকিৎসা হিসেবেও একাধিক জোরালো টিউবলাইটের ব্যবহার করা হয়, শুধু ওষুধে এই রোগ সারে না। এ দেশে একটা সময়ে শীতকালে ‘উইন্টার ম্যানিয়া’ বলে এক ধরনের মনোরোগ নিয়ে কিছু আলোচনা হত, এখন আর সেটা খুব শোনা যায় না। সম্ভবত খুব সফলভাবে সমস্যাটাকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো যেহেতু এখানে সারা বছরই মেলে, তাই ডিপ্রেশনের সঙ্গে ঋতুভেদকে সেভাবে যুক্ত করা যায় না।’’
কিন্তু বর্ষায় তো আকাশ মেঘে ঢেকে থাকে দিনের অনেকটা সময়, কাজে মন লাগে না… সেগুলো কি তা হলে মনের ভুল? ডা. দেবের বক্তব্য, ‘‘দেখুন, ‘কথার কথা’ বলে যেগুলোকে আমরা সাধারণত উড়িয়ে দিই, সেগুলির প্রচলনের পিছনেও একটা কারণ থাকে। বর্ষায় চারপাশের সবকিছু ভিজে স্যাঁতস্যাঁত করে, বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না, এনার্জির অভাব প্রতি পদে টের পাই আমরা। মজাটা হচ্ছে, ঠিক এই একই সমস্যাগুলো কিন্তু অতিরিক্ত গরমের সময়েও হয়, অথচ সেটাকে আমরা মন খারাপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি না! তখন আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি যে, ঘাম হচ্ছে, শরীর থেকে ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যাচ্ছে, তাই ক্লান্ত লাগছে। অবশ্য এটা ঠিক যে, প্যাচপেচে কাদা বা ভনভনে মশার মতো বর্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যাপারগুলো কারওই পছন্দ হতে পারে না। আর যাঁরা সাধারণত গরম পড়লে ‘উফ, কী গরম’ বলে অস্থির হয়ে পড়েন, তাঁরাই বর্ষা আসার সাতদিনের মধ্যেই ‘ও বাবা, কী বৃষ্টি! মন খারাপ হচ্ছে, আর পারা যাচ্ছে না!’ বলে কাতর হয়ে পড়েন।’’
এই পরিস্থিতিতে তা হলে কী করা যেতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষায় যে মন খারাপ হয় আপনার, সেটা মেনে নিন। একবার যদি নিজের মন খারাপের কারণগুলোকে খুঁজে বের করে নিতে পারেন, তা হলে তার সঙ্গে লড়াই করাটাও অনেক সহজ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ সেক্ষেত্রে বর্ষা আসার আগে থেকেই আপনি প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
অসহ্য লাগলে বৃষ্টি যখন হচ্ছে, তখন বাইরে বেরোবেন না। কিন্তু আজকাল কাজের সূত্রে প্রায় সকলকেই কোনও না কোনও সময় বেরোতে হয়। আচ্ছা, ছোটবেলায় যখন স্কুল ছুটির আগে বৃষ্টি নামত, তখনও কি মন খারাপ লাগত আপনার? নাকি রাস্তায় জমা জলে লাফঝাঁপ করে বাড়ি ফিরতে খুব মজা লাগত? তেমনটাই একবার করে দেখুন না! ডা. দেব বলছেন, ‘‘দরকারে বাড়ি এসে না হয় জলে বেশ করে অ্যান্টিসেপটিক ঢেলে স্নান করে নেবেন, কিন্তু এই ছোট ছোট মজাগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।’’
সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বা মনের মানুষের সঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটুন, যা যা খেলে মন ভালো থাকে, সে সব খান, ভালো বই-টই পড়ুন, গান শুনুন। রোজের রুটিন থেকে সরে যাবেন না, যদি ব্যায়াম করার অভ্যেস থাকে, তা হলে অবশ্যই করুন। মর্নিং ওয়াকে যেতে না পারলে, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ় করুন বাড়ির ভিতর। দেখবেন, বর্ষা আপনার মনকে মোটেই স্যাঁতসেঁতে করে রাখতে পারবে না।





