ভাত খেলেই কি চোখে ঘুম নেমে আসে? ভাতের সঙ্গে ঘুমের এই রহস্য জানলে চমকে উঠবেন!

পেট ভরে ভাত খাওয়ার পর চোখে ঘুম নেমে আসা বা শরীর এলিয়ে দেওয়া—এমন অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে। অনেকেই মনে করেন, অতিরিক্ত ভাত খেয়ে ফেলার কারণেই এমনটা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে শরীরের এক জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া। ভাত একটি শর্করা-সমৃদ্ধ খাবার, যা শরীরে এমন কিছু হরমোনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা শরীরকে শিথিল করে এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তোলে।

কেন ভাত খেলে ঘুম পায়?
ভাত খাওয়ার পর যে অবসাদ ভর করে, তা কেবল বেশি খাওয়ার ফল নয়। ভাত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ, যা শরীরে ইনসুলিন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে। ইনসুলিন রক্তপ্রবাহ থেকে অন্যান্য অ্যামাইনো অ্যাসিড সরিয়ে দিতে সাহায্য করে, কিন্তু ‘ট্রিপটোফ্যান’ রয়ে যায়। ট্রিপটোফ্যান তখন সহজেই মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং সেখানে ‘সেরোটোনিন’ ও ‘মেলাটোনিনে’ রূপান্তরিত হয়। মেলাটোনিন হলো সেই হরমোন যা আমাদের ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, এই তন্দ্রাভাব পুরোপুরি জৈব-রাসায়নিক।

ভাতের পরিমাণ ও ধরন কি দায়ী?
হ্যাঁ, ভাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে আপনার শক্তির স্তর কতটা কমবে। বেশি ভাত খেলে শরীরের পুরো রক্তপ্রবাহ হজমের দিকে ধাবিত হয়, ফলে শরীরের এনার্জি কমে যায়। সাদা চাল বেশি পরিশোধিত হওয়ায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং তারপর হঠাৎ কমিয়ে ফেলে, যাকে বলা হয় ‘সুগার ক্র্যাশ’। এই কারণেই ভাতের পরে অবসাদ বেশি অনুভূত হয়। তবে এটি কেবল ভাতের দোষ নয়, উচ্চ-গ্লাইসেমিক কার্বোহাইড্রেটযুক্ত যে কোনো খাবারই এই ফলাফল দিতে পারে।

সমস্যা এড়ানোর উপায়
ভাত পুরোপুরি বাদ না দিয়ে বরং খাওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনুন। ভাত প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খান, যেমন—ডাল, সবজি বা চর্বিহীন প্রোটিন। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকবে। খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করুন, এতে বিকেলজুড়ে কর্মক্ষমতা বজায় থাকবে।

গবেষণায় কী বলছে?
‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভাত খাওয়ার সঙ্গে ঘুমের গভীরতার সরাসরি যোগ আছে। ৬০ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ভাত খেয়েছেন, তাদের ঘুমের মানের স্কোরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। রক্ত পরীক্ষায় আরও জানা গেছে, নিয়মিত ভাত খাওয়া ব্যক্তিদের শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা অন্যদের চেয়ে কম। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমলে শরীর দ্রুত সেরে ওঠে এবং ভালো ঘুম হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাতের গভীর ঘুমের জন্য নিয়মিত ভাত খাওয়া একটি সহজ এবং প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে পারে।

পরিশেষে, ভাত কেবল পেট ভরায় না, এটি ভালো ঘুমের জন্য শরীরের রাসায়নিক ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক। পরিমিত এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে ভাত খেয়ে অবসন্ন হওয়া বা অলসতা কাটিয়ে আপনি সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকতে পারবেন।