বিয়ের জন্য সোয়াইপিং অতীত! জাপানের তরুণ-তরুণীদের এই নতুন ট্রেন্ড তাক লাগাচ্ছে বিশ্বকে

ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোনো মূল্য না থাকলেও, জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার জন্য জাপানের তরুণ-তরুণীরা এখন আর ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে নেই। বরং পেশাদার ম্যাচমেকিং সংস্থার হাত ধরে পাকাপাকিভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসার প্রবণতা দেশটিতে হু হু করে বাড়ছে। ডেটিং অ্যাপের অন্তহীন সোয়াইপিং থেকে তৈরি হওয়া ক্লান্তি এবং আধুনিক ব্যস্ততার যুগে জাপানি যুবসমাজ যেভাবে এই কর্পোরেট ঘটকালির দিকে ঝুঁকছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
ডেটিং অ্যাপে ক্লান্তি আর পুরনো প্রথার পুনরুত্থান
জাপানে একসময় ‘ওমিয়াই’ নামের ঐতিহ্যবাহী ঘটকালি প্রথা বেশ জনপ্রিয় ছিল। আত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু বা কর্মক্ষেত্রের বয়োজ্যেষ্ঠরা অবিবাহিত নারী-পুরুষের যোগাযোগ করিয়ে দিতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারা বদলে জায়গা নেয় ডেটিং অ্যাপ। কিন্তু অল্প সময়ে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলেও, অনলাইন ডেটিংয়ের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে এখন বিরক্ত দেশটির তরুণ প্রজন্ম।
অনলাইনে পরিচয়ের পর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, ভুয়া প্রোফাইল কিংবা অপর পক্ষের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে না পারার অভিজ্ঞতায় অনেকেই আজ ক্লান্ত। ফলস্বরূপ, যারা শুরু থেকেই ছক বাঁধা জীবনের বাইরে গিয়ে সরাসরি বিয়ের কথা মাথায় রেখে এগোতে চান, তাদের কাছে পেশাদার ম্যাচমেকিং বা আধুনিক ওমিয়াই ব্যবস্থা দারুণভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
অ্যালগরিদম নয়, এবার ভরসা প্রফেশনাল কাউন্সিলর
আধুনিক এই ম্যাচমেকিং ব্যবসার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এখানে কেবল কম্পিউটার বা কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপের অ্যালগরিদম কাজ করে না। বরং প্রতিটি সদস্যের জন্য একজন করে ডেডিকেটেড কাউন্সিলর থাকেন।
টোকিওর জনপ্রিয় ম্যাচমেকিং সংস্থা ‘আইবিজে’-এর গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাই বলে দেয় এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা। প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সম্ভাব্য পাত্র বা পাত্রীর তালিকা ছোট করে আনা থেকে শুরু করে, কাউন্সিলররা হাতে ধরে শিখিয়ে দেন কীভাবে অন্যের সামনে নিজের কথা বলতে হবে বা অস্বস্তিকর প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এমনকি বাস্তব ডেটে যাওয়ার আগে ‘মহড়া ডেট’ বা মক সেশনেরও ব্যবস্থা থাকে, যাতে প্রথম সাক্ষাতেই ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ না থাকে। দুই পক্ষের কাউন্সিলররা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখে সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান, যাকে তারা অভিহিত করছেন ‘কিউপিড ওয়ার্ক’ হিসেবে।
চড়া মূল্যের এই সেবা নিয়ে বিতর্কও কম নয়
অবশ্য পেশাদার এই সেবার জন্য গুনতে হচ্ছে ভালোমতোই অর্থ। সদস্যপদ বাবদ প্রতি মাসে ৩০ থেকে ১০০ ডলার, ভর্তি ফি বাবদ ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলার এবং বাগদান সফল হলে অতিরিক্ত ‘সাফল্য ফি’ হিসেবে দিতে হচ্ছে আরও ১ হাজার ৩০০ ডলার।
এই বাণিজ্যিকীকরণ ও কড়া নিয়মকানুন নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্নও রয়েছে। তাদের মতে, পারিবারিক ঘটকালির যে আবেগময় পরিবেশ ছিল, কর্পোরেট সংস্থাগুলো তাকে পুরোপুরি একটি যান্ত্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত করেছে। অন্যদিকে, প্রবীণ ঘটক থেকে শুরু করে বড় বড় সংস্থাগুলোর দাবি, আধুনিক যুগে মানুষের সময়ের মূল্য অনেক বেশি। তাই একই সঙ্গে বিয়েতে আগ্রহী উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীকে দ্রুত খুঁজে দেওয়ার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই আধুনিক ব্যবস্থা।
জন্মহার ও জনসংখ্যা সংকটের সমীকরণ
জাপানের এই প্রবণতাকে দেশের বৃহত্তর জনসংখ্যাগত সংকটের বাইরে গিয়ে দেখার সুযোগ নেই। দেশটিতে বিবাহ এবং সন্তান জন্মদানের বিষয়টি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে বিয়ের সংখ্যা বাড়ানোর এই উদ্যোগকে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলার আলোচনার সঙ্গেও বেশ জোরালোভাবেই যুক্ত করা হচ্ছে।
একসময়কার ঐতিহ্যবাহী ‘ওমিয়াই’ প্রথা আজ আধুনিক প্রযুক্তি, পেশাদার কাউন্সেলিং এবং বাণিজ্যিক পরিষেবার হাত ধরে যেভাবে নতুন রূপ নিয়েছে, তা শুধু জাপানের সমাজ ব্যবস্থাতেই নয়, বরং আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণকেও পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।