দিনে ৩ বেলা খেয়েও রোগা হওয়া সম্ভব? ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে বিশেষজ্ঞের কড়া সতর্কতা!

ওজন কমানো এবং ফিট থাকার লড়াইয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা অন্তর্বর্তী উপবাস পদ্ধতিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে অনাহার থাকা কিংবা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের খাওয়া-দাওয়া সীমাবদ্ধ রাখাই এই জনপ্রিয় খাদ্যাভ্যাসের মূল ভিত্তি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সাধারণ ক্যালরি নিয়ন্ত্রিত ডায়েটের তুলনায় এই পদ্ধতি দ্রুত ওজন কমাতে এবং ক্যানসার কিংবা স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে বেশি কার্যকর। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে বাজারে প্রচলিত জাদুকরী সুবিধার সবগুলো এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয় এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই রয়েছে নানা দ্বিমত।

শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের খ্যাতনামা অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অন্য সাধারণ ডায়েট কৌশলের মতোই কাজ করে, এর অতিরিক্ত কোনো জাদুকরী ক্ষমতা নেই। বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলও সব সময় একরকম হয়নি; কোথাও এটি দারুণ ফল দিয়েছে, আবার কোথাও এর কার্যকারিতা খুবই সীমিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই উপবাসের কারণে উল্টো হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার মতো আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। আমাদের প্রাচীন মানব সমাজের খাদ্যাভ্যাস থেকে এই পদ্ধতির ধারণা এলেও, আধুনিক মানুষের শরীর ও জীবনযাত্রার সঙ্গে তার ফারাক আকাশ-পাতাল।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্ক ম্যাটসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ এমন একটি বিবর্তনীয় পরিবেশে বড় হয়নি যেখানে দিনের তিন বেলা ভরপেট খাবারের সঙ্গে একাধিকবার নাশতা করার সুযোগ থাকে। উপবাসের সময় শরীরের ভেতরের বিপাকক্রিয়া প্রথমে সহজে উপলব্ধ চিনি পোড়ানো বন্ধ করে রক্তে সঞ্চালিত অতিরিক্ত চর্বি পোড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। এই রূপান্তরের ফলে শরীরের কোষগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন পুনরায় ব্যবহার করতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অটোফ্যাজি’ বলা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এই প্রক্রিয়া থেকেই দীর্ঘায়ু লাভ, ডায়াবেটিস এবং ক্যানসারের মতো কঠিন রোগ প্রতিরোধের দাবিগুলোর সূত্রপাত হয়েছে।

তবে এই সমস্ত আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ ফলাফলের বড় অংশটিই এসেছে মূলত ইঁদুর, মাছি ও কৃমির মতো প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। মানুষের শরীরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া পুরোপুরি আলাদা হওয়ায় এর ফলাফল কখনোই ইঁদুরের সঙ্গে হুবহু মিলে যায় না। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোর্টনি পিটারসনের মতে, একটি ছোট কৃন্তক প্রাণীর ক্ষেত্রে ১৬ ঘণ্টার উপবাস মানুষের দীর্ঘ কয়েকদিনের উপবাসের সমান হতে পারে। তাছাড়া গবেষণার জন্য ব্যবহৃত ইঁদুরগুলো জিনগতভাবে প্রায় একই প্রকৃতির হলেও, মানুষের মধ্যে রয়েছে বিশাল জৈবিক ও খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্য। এর পাশাপাশি মানুষ আসলে প্রতিদিন ঠিক কী পরিমাণ খাবার খাচ্ছে, তার সঠিক হিসাব রাখাটাই গবেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাবারের পুষ্টিমূল্য ও ক্যালরির হিসাবে মানুষের অসচেতনতা বা লুকোচুরিও গবেষণার ফলাফলকে বিভ্রান্ত করে তোলে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মানুষদের দৈনিক খাবারের সঠিক তালিকা বা ফুড ডায়েরি রাখতে বলা হলেও বেশিরভাগ মানুষই সঠিক তথ্য দিতে ভুলে যান কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তা বাদ দেন। অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডির প্রাক্কলন অনুযায়ী, তাঁর গবেষণায় অংশ নেওয়া মাত্র প্রায় অর্ধেক মানুষ খাবারের নিখুঁত রেকর্ড জমা দেন। অনেক সময় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দেখান বা ভুল তথ্য পরিবেশন করেন। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, মানুষ গড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি বা তারও বেশি কম রিপোর্ট করে থাকে। অনেক সময় কেউ দিনে মাত্র ১,৬০০ থেকে ২,০০০ ক্যালরি খাওয়ার দাবি করলেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তাঁদের প্রকৃত শক্তি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৩,৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

এই সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করতে এবং খাদ্যাভ্যাসের নিখুঁত তথ্য পেতে আধুনিক গবেষকেরা এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভরসা করছেন। ইনপেশেন্ট ফিডিং ট্রায়ালের মতো কঠোর ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণকারীদের খাবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে, যার ফলে সঠিক তথ্য মেলা সম্ভব হয়। এসব ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ কমা এবং অটোফ্যাজি বৃদ্ধির মতো ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও, এই পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং স্বল্পমেয়াদি হয়ে থাকে। বর্তমানে খাবারের ছবি তুলতে সক্ষম ক্যামেরা, বিশেষ নেকলেস, স্মার্ট ফর্ক এবং দাঁতে বসানো নিউট্রিয়েন্ট সেন্সর নিয়ে নানা গবেষণা চলছে। শরীরের ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট প্রক্রিয়াকরণ বুঝতে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষাও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচারে না ভুজে বিজ্ঞানের সঠিক তথ্যের ওপর ভরসা করেই ডায়েট বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।