জন্মের প্রথম মিনিটেই সন্তানের কান্না শোনার জন্য কেন অপেক্ষা করেন চিকিৎসকরা? জানুন যুগান্তকারী রহস্য

পৃথিবীতে আসার মুহূর্তেই প্রতিটি সুস্থ নবজাতকের গলার প্রথম আওয়াজ হিসেবে তার কান্না শোনা যায়। সন্তানের এই প্রথম কান্না শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকেন মা-বাবা থেকে শুরু করে অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত চিকিৎসকরাও। যুগ যুগ ধরে এই কান্নাকে সুস্থ জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে মনে করা হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং চিকিৎসাগত সত্য। প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দীর্ঘদিন আগেই এই রহস্যের উৎঘাটন করেছেন। তাঁদের মতে, নবজাতকের এই প্রথম কান্না কোনো সাধারণ আবেগ বা দুঃখের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি তার জীবনের প্রথম বেঁচে থাকার লড়াই এবং স্বয়ংক্রিয় শারীরিক প্রক্রিয়ার এক অনিবার্য ধাপ।
গর্ভাবস্থার পুরো সময়জুড়ে মায়ের গর্ভাশয়ে বা অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের ঘেরাটোপে সুরক্ষিত থাকে ভ্রূণ। সেই সময় গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুস সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে এবং তার শরীরে অক্সিজেনের জোগান নিরবিচ্ছিন্নভাবে বজায় থাকে অমরা বা প্লাসেন্টার মাধ্যমে। কিন্তু প্রসবের পর যখন শিশুটি জরায়ুর বাইরে বাহ্যিক জগতের সংস্পর্শে আসে, তখন তার শরীরে হঠাৎ করেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মায়ের শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঠিক পরপরই নবজাতককে নিজের ফুসফুসের সাহায্যে স্বাধীনভাবে শ্বাসকার্য শুরু করতে হয়। আর এই নবজাতক ফুসফুসকে প্রথমবারের মতো বাতাসে প্রসারিত করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো কান্না।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যখন একটি শিশু জন্মের পর প্রথমবার শব্দ করে কেঁদে ওঠে, তখন তার ফুসফুসের ভেতরে থাকা সমস্ত তরল পদার্থ বা অ্যামনিওটিক তরল বাইরে বেরিয়ে যায়। একই সঙ্গে ফুসফুসের কুঠুরি বা অ্যালভিওলাইগুলো প্রথমবারের মতো অক্সিজেন দ্বারা পূর্ণ হয়ে প্রসারিত হয়। এর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিষ্কাশন ঘটে এবং শরীরে অক্সিজেনের স্বাভাবিক সঞ্চালন শুরু হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ফুসফুসের কার্যকারিতা চালুর প্রথম পদক্ষেপ বলা চলে। এই কারণে জন্মমুহূর্তে কোনো শিশু যদি তাৎক্ষণিকভাবে না কাঁদে, তবে চিকিৎসকরা তার পিঠে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বা বিশেষ পদ্ধতিতে কান্না করানোর চেষ্টা করেন, যাতে তার শ্বাসতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করতে শুরু করে।
ফুসফুসের প্রসারণ ছাড়াও এই প্রথম কান্না স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক বিকাশ এবং স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। জন্মের ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শিশু সম্পূর্ণ অন্ধকার, উষ্ণ এবং একঘেয়ে পরিবেশে থাকে। হঠাৎ করেই যখন সে বাইরের আলো, কোলাহল এবং তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশের মুখোমুখি হয়, তখন এক ধরণের স্নায়বিক ধাক্কা বা সেন্সরি শক কাজ করে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। তাই ছোট্ট শিশুটির এই প্রথম কান্না আসলে কোনো কষ্টের কান্নাকাটি নয়, বরং এটি প্রকৃতির এক অপূর্ব নিয়ম যা তাকে একটি সুস্থ, সবল ও স্বাধীন জীবনের বার্তা দেয়।