‘একদিন কাজে লাগবে’—এই ভাবনাই কি বিপদ ডাকছে? কখন সতর্ক হবেন জেনে নিন

আলমারিতে খালি বোতল, বারান্দায় ভাঙা চেয়ার, কিংবা ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরোনো কাগজের স্তূপ—এসব দেখে আমরা অনেকেই বলি ‘একদিন না একদিন কাজে লাগবে’। কিন্তু এই ‘কাজে লাগবে’র অজুহাত যখন ঘর দখলের পর্যায়ে চলে যায় এবং দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি তৈরি করে, তখন সাবধান হওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘হোর্ডিং ডিজঅর্ডার’ (Hoarding Disorder), যা একটি জটিল মানসিক সমস্যা।

হোর্ডিং ডিজঅর্ডার কী? এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি তার সংগ্রহে থাকা তুচ্ছ বা মূল্যহীন জিনিসগুলো কিছুতেই ফেলে দিতে পারেন না। তাঁদের মনে হয়, ভবিষ্যতে এগুলো হয়তো কাজে লাগবে, অথবা এগুলো ফেলে দিলে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে ঘর ভর্তি হয়ে যায় অকেজো জিনিসে, যা শেষ পর্যন্ত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

কেন এমন হয়? চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, এটি ওসিডি (OCD)-র অংশ নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র মানসিক রোগ। এর নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু কারণ:

  • বংশগত বা জিনগত প্রভাব: পরিবারের কারও থাকলে এই প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

  • নিরাপত্তাহীনতা: অতিরিক্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষেরা জিনিসের মাঝে আশ্রয় খোঁজেন।

  • স্মৃতির টান: কোনো প্রিয় মানুষ বা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জিনিস ফেলে দিতে গেলে তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

  • সিদ্ধান্তহীনতা: কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি নয়, তা বেছে নিতে অক্ষমতা।

আপনি কি হোর্ডিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত? চিনে নিন লক্ষণ: যদি আপনার বা পরিচিত কারও মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখেন, তবে সতর্ক হতে হবে: ১. ঘরভর্তি জঞ্জাল হয়ে যাওয়ায় হাঁটাচলার জায়গাও কমে যাওয়া। ২. জিনিস ফেলে দিতে বললে তীব্র রাগ বা উদ্বেগ অনুভব করা। ৩. পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া। ৪. বিষয়টি নিয়ে নিজেরও অস্বস্তি হওয়া, কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে না পারা।

চিকিৎসা ও করণীয়: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের সমস্যাটি স্বীকার করতে চান না। তবে সঠিক চিকিৎসায় এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

  • কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT): চিকিৎসকরা থেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে জিনিস ছাড়ার মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করেন।

  • ওষুধ: উদ্বেগ বা অবসাদ থাকলে চিকিৎসকরা এসএসআরআই (SSRI) শ্রেণির ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

  • পারিবারিক সচেতনতা: আক্রান্ত ব্যক্তিকে জোর করে জিনিস ফেলে দিতে বাধ্য করবেন না। এতে প্যানিক অ্যাটাকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বরং সহানুভূতির সঙ্গে কথা বলুন এবং প্রয়োজনবোধে অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অপ্রয়োজনীয় জিনিসের স্তূপ ঘরকে জঞ্জাল করে তুলছে, আর সেই জঞ্জাল মানুষের মনেও তৈরি করছে দেয়াল। সঠিক সময়ে সচেতনতাই পারে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে।