শরীরে টিউমারের মতো কিছু? ভয় নয়, জানুন ক্যান্সার চেনার উপায়

শরীরে কোনো অস্বাভাবিক ফোলা মাংসপিণ্ড বা লাম্প দেখা দিলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, মনে প্রশ্ন জাগে – এটা কি টিউমার? ক্যান্সার ছড়াচ্ছে না তো? তবে শরীরের কোনো অংশে টিউমারের মতো কিছু অনুভব করলেই সঙ্গে সঙ্গে ভয় পাওয়ার কারণ নেই, তবে অবহেলাও করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো এবং রোগ নির্ণয় করা জরুরি।

বেনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট:

টিউমার প্রধানত দুই ধরনের হয় – বেনাইন (ক্ষতিকর নয়) এবং ম্যালিগন্যান্ট (ক্ষতিকর)। অনেক সময় জন্ম থেকেই বা ছোটবেলা থেকে শরীরে বেনাইন টিউমার থাকতে পারে। এতে সাধারণত ভয়ের কিছু নেই, কারণ বেনাইন টিউমারে ক্যান্সারের প্রবণতা থাকে না এবং এটি যে স্থানে হয়, তার आसपासের কোষ বা শরীরের অন্য অংশে ছড়ায় না। তবে, বেনাইন টিউমারও গুরুতর হতে পারে যদি তা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেমন রক্তের কোষ বা স্নায়ুতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বেনাইন টিউমারের চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, ম্যালিগন্যান্ট টিউমার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সারিয়ে তোলা সম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একবার অপসারণের পর তা পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কম থাকে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার থেকেই ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। এই ধরনের টিউমার ধীরে ধীরে তার চারপাশের কোষ এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

টিউমার থেকে ক্যান্সার বুঝবেন যেভাবে:

বেশিরভাগ ক্যান্সার ম্যালিগন্যান্ট টিউমার থেকেই হয়। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন ঘটে, ফলে টিউমারের আকার ক্রমশ বাড়তে থাকে। যদি কোনো ফোলা মাংসপিণ্ডের আকার বাড়তে দেখেন, তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আঘাতের কারণে ফোলা বা কাটা স্থান থেকেও অনেক সময় ক্যান্সার হতে পারে। কিছু ক্যান্সার ত্বকের মাধ্যমে অনুভূত হয়, যা প্রধানত স্তন, অণ্ডকোষ, প্রোস্টেট গ্রন্থি এবং শরীরের নরম টিস্যুতে বেশি দেখা যায়। টিউমার বা যেকোনো ধরনের ফোলা মাংসপিণ্ড ক্যান্সারের প্রাথমিক বা শেষ পর্যায়ে দেখা দিতে পারে। এর আকার বাড়তে দেখলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। প্রাথমিকভাবে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে ব্যথা অনুভূত না হলেও, কিছুদিন পর ওজন হ্রাস এবং রক্তাল্পতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। টিউমারের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে এটি आसपासের স্নায়ু ও পেশিতে চাপ সৃষ্টি করে, তখনই ব্যথা বা যন্ত্রণা অনুভূত হয়।

ক্যান্সারের কিছু সাধারণ উপসর্গ:

১) ফুসফুস ক্যান্সার: দীর্ঘদিনের শুকনো কাশি, কাশির সাথে রক্ত, বুকে ব্যথা, ওজন হ্রাস, শ্বাসকষ্ট।
২) লিম্ফোমা ক্যান্সার: লসিকা গ্রন্থির আকৃতি বৃদ্ধি, দুর্বলতা, ওজন হ্রাস।
৩) স্তন ক্যান্সার: স্তনে টিউমার বা মাংসপিণ্ড, স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত নিঃসরণ, স্তন ও স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন।
৪) প্রোস্টেট ক্যান্সার: প্রস্রাবে সমস্যা, যদিও অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না। ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
৫) বোসাল সেল ক্যান্সার: মুখ ও গলার মতো সূর্যের আলোয় উন্মুক্ত অংশে সাদা টিউমার বা বাদামি ছোপ দাগ।
৬) মেলানোমা স্কিন ক্যান্সার: শরীরের যেকোনো অংশে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা আঁচিলের আকারে পরিবর্তন।
৭) কোলন ক্যান্সার: মলের অভ্যাসে পরিবর্তন, মলের সাথে রক্ত, পেটে অস্বস্তি।
৮) লিউকিমিয়া: ধীরে বা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে পারে। দ্রুত বৃদ্ধিতে দুর্বলতা, ওজন হ্রাস, সহজে রক্তক্ষরণ, মাথাব্যথা, ঘাম, ত্বকে লাল ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট।
৯) অন্যান্য ক্যান্সার: হঠাৎ খিদে কমে যাওয়া, ওজন হ্রাস, রক্তাল্পতা, মলের সাথে রক্ত ইত্যাদি যেকোনো কিছুই ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এইচপিভি ভাইরাস জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

শরীরে এই ধরনের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ব্রেস্ট ক্যান্সার এড়াতে সতর্কতা:

প্রাথমিকভাবে স্তনে টিউমারের মতো ফোলা মাংসপিণ্ড অনুভব হতে পারে, যা থেকে ধীরে ধীরে ব্যথা, ফুসকুড়ি বা চুলকানি হতে পারে। তবে স্তনে সামান্য ফোলাভাব দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই, কারণ অনেক ক্ষেত্রে তা ক্যান্সার নাও হতে পারে। তবে যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন নজরে এলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করানো এবং কোনো পরিবর্তন দেখলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।