শরীরে কত ধরনের মেদ থাকে ও কোনটি ক্ষতিকর? জানুন বিস্তারিত

অতিরিক্ত মেদ বা চর্বি ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। শুধু তাই নয়, এই অতিরিক্ত মেদ শরীরের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে আমাদের শরীরে ঠিক কত ধরনের মেদ থাকে এবং কোন মেদ শরীরের জন্য ক্ষতিকর, সে বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। মেদ আসলে স্নেহজাতীয় পদার্থ এবং প্রোটিন, শর্করা ও স্নেহ পদার্থ – এই তিনটি উপাদানই আমাদের শরীর গঠনের মূল ভিত্তি। তাই ফ্যাট শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, তবে ভালো ও খারাপ ফ্যাটের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

শরীরের ভালো ফ্যাট যেমন আমাদের জন্য উপকারী, তেমনই অতিরিক্ত খারাপ ফ্যাট বিভিন্ন রোগ ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে যাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মেদ না জমে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। চলুন, জেনে নেওয়া যাক আমাদের শরীরে কত ধরনের ফ্যাট বা চর্বি বিদ্যমান:

১. বেইজ ফ্যাট (Beige Fat): এই ফ্যাট হলো সাদা ও বাদামি চর্বির একটি মিশ্রণ। যখন আমরা ব্যায়াম করি, তখন শরীর সাদা চর্বিকে ইরিসিন নামক হরমোন ব্যবহার করে বেইজ ফ্যাটে রূপান্তরিত করে। এই প্রক্রিয়াটিকে ‘ব্রাউনিং’ বলা হয়ে থাকে। সাধারণত গলার হাড়ের আশেপাশে এবং মেরুদণ্ড বরাবর এই ধরনের ফ্যাট পাওয়া যায়। মনে করা হয়, আঙুরের মতো সাইট্রাস জাতীয় খাবার গ্রহণ এই ব্রাউনিং প্রক্রিয়াকে ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

২. ব্রাউন বা বাদামি ফ্যাট (Brown Fat): এটি একটি ভালো চর্বি এবং সাধারণত ঘাড়ের পেছন দিকে ও বুকে এর অবস্থান দেখা যায়। এটি ব্রাউন অ্যাডিপোজ টিস্যু বা বিএটি (BAT) নামেও পরিচিত। এই চর্বি আমাদের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মাধ্যমে এই ফ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

৩. ভিসেরাল ফ্যাট (Visceral Fat): এই ফ্যাটটি কমবেশি সকলের কাছেই একটি পরিচিত নাম এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভুঁড়িতে যে চর্বি জমে, তার প্রধান কারণ হলো এই ভিসেরাল ফ্যাট। যদিও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সুরক্ষার জন্য সামান্য পরিমাণে এই স্নেহ পদার্থের প্রয়োজন রয়েছে, তবে অতিরিক্ত পরিমাণে জমলে তা কোলেস্টেরল, ক্যানসার, হৃদরোগ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৪. সাদা সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট (White Subcutaneous Fat): এই ফ্যাট আমাদের শরীরের চর্বিযুক্ত সাদা ফ্যাটের ভাণ্ডারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এমনকি ত্বকের নিচের এই সাদা চর্বি অ্যাডিপোনেক্টিন নামক একটি উপাদান উৎপাদনের মাধ্যমে শরীরে যে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়, তাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সাদা সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট সাধারণত শরীরের জন্য ভালো। তবে এর পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অ্যাডিপোনেক্টিনের অত্যধিক ক্ষরণ হতে পারে, যা শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। একইসঙ্গে নিতম্ব, উরু ও পেটের চারপাশে চর্বির পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে।

৫. সাবকুটেনিয়াস ফ্যাট (Subcutaneous Fat): এই চর্বি ত্বকের ঠিক নিচে অবস্থান করে এবং সাধারণত নিতম্ব, বাহু ও পায়ের পেছনের দিকে এটি জমে থাকে। তবে পেটে এই মেদের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং পেটের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। ত্বকের নিচে এই চর্বি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো শরীরে ইস্ট্রোজেনের আধিক্য। এই হরমোন শরীরে অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পেলে নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি হতে পারে।

সুতরাং, শরীরের বিভিন্ন ধরনের মেদ এবং তাদের কার্যকারিতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা আমাদের সুস্থ জীবন যাপনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কোন ফ্যাট আমাদের জন্য উপকারী এবং কোনটি ক্ষতিকর, তা জেনে আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত মেদের ঝুঁকি কমাতে পারি।