ফ্যাটি লিভারের মতো এবার ভয় ধরাচ্ছে ‘ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস’! শরীরে এই রোগ বাসা বাঁধেনি তো?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এতদিন এটাই ধারণা ছিল যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে বা ওজন বৃদ্ধির ফলে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসে সামান্য পরিমাণে চর্বি জমা একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষকদের সাম্প্রতিক ও নতুন কিছু তথ্য এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার রিভিউস গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এবং হেপাটোলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, অগ্ন্যাশয়ে অতিরিক্ত চর্বি জমা কেবল সাধারণ কোনো বিষয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতে ডায়াবিটিস, প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং প্রাণঘাতী প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের মতো মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার’ (Fatty Pancreas Disorder) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়মতো এটি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার আসলে কী?

ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে অগ্ন্যাশয়ের কোষ ও টিস্যুর ভেতরে অস্বাভাবিকভাবে চর্বি জমতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে ওই অঙ্গটিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (Inflammation) বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হয়। এই প্রদাহ ধীরে ধীরে ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বা সুগার নিয়ন্ত্রণে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি, অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য জটিল রোগও শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

কেন এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষকদের মতে, ফ্যাটি প্যানক্রিয়াসকে সামান্য বা অবহেলার বিষয় হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি শরীরের বড় ধরনের বিপাকজনিত (Metabolic) সমস্যার একটি পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই অবস্থার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবিটিস, অ্যাকিউট ও ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ঝুঁকির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। তাই স্ক্যান রিপোর্টে প্যানক্রিয়াসে অতিরিক্ত চর্বি ধরা পড়লে তা অবহেলা না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শুধু কি অতিরিক্ত ওজন হলেই এই সমস্যা হয়?

অনেকেরই ধারণা যে কেবল স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদেরই ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস হতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।

গবেষকদের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাভাবিক বা তুলনামূলক কম ওজনের মানুষদেরও প্যানক্রিয়াস ও লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ, শরীর বাইরে থেকে রোগা বা স্লিম দেখালেও ভেতরের vital অঙ্গগুলোতে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে ডায়াবিটিসের বংশগত ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও অনেক বেশি থাকে।

সামান্য চর্বি থাকলেই কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?

না, সব চর্বি জমানোই ভয়ের নয়। চিকিৎসকদের মতে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ে অল্প পরিমাণে চর্বি জমা একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, যাকে ইনট্রা-প্যানক্রিয়াটিক ফ্যাট ডিপোজিশন (Intra-pancreatic fat deposition) বলা হয়।

কিন্তু যখন এই চর্বির পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে শুরু করে, তখন তাকে ‘ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, সামান্য চর্বি রোগ না হলেও অতিরিক্ত জমা হওয়া সবসময়ই সতর্কতার বিষয়।

কীভাবে এটি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব?

  • পরীক্ষা-নিরীক্ষা: প্যানক্রিয়াসে চর্বি জমার সঠিক মাত্রা নির্ণয় করতে বর্তমানে এমআরআই (MRI) সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যানে অনেক সময় এই সমস্যা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না।

  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সঠিক লাইফস্টাইল। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

  • অন্যান্য সতর্কতা: ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং ডায়াবিটিস থাকলে তা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক। এছাড়া পরিবারে ডায়াবিটিস বা ফ্যাটি লিভারের সমস্যা থাকলে নিয়মিত হেলথ চেকআপ করানো উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস এমন একটি নীরব সমস্যা যা দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই কেবল অসুস্থ হয়ে পড়ার অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই এর একমাত্র ও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।