মহালয়াতে উত্তম কুমার বনাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, এক অভিশপ্ত অধ্যায়

বাংলায় মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ শোনাটা বাঙালির কাছে একটি প্রথা। কিন্তু ১৯৭৬ সালে সেই প্রথায় ছেদ পড়েছিল। দেশের জরুরি অবস্থার সুযোগে কলকাতার আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নেন। নতুন প্রজন্মকে নতুন কিছু উপহার দেওয়ার অজুহাতে, ৪০ বছর ধরে চলে আসা এই অনুষ্ঠানে বদল আনার পরিকল্পনা করা হয়। আর মহিষাসুরমর্দ্দিনীর নতুন ভাষ্যকারের ভূমিকায় বেছে নেওয়া হয় বাঙালির ম্যাটিনি আইডল মহানায়ক উত্তম কুমারকে।

১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তাঁর ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবির বিপুল সাফল্যের পর বাঙালি দর্শক তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। তাই আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল, উত্তম কুমারকে দিয়ে নতুন করে ‘দেবী দূর্গতিহারিণী’ নামে অনুষ্ঠানটি তৈরি করলে তা আরও জনপ্রিয়তা পাবে।

জানা যায়, প্রথমে উত্তম কুমার এই প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, “দর্শক মেনে নেবে না।” কিন্তু আকাশবাণীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চাপের মুখে এবং সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-এর অনুরোধে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এমনকি, তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে দেখা করেও তাঁর অনুমতি নেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রও তাকে ভরসা দিয়ে বলেন যে বাঙালি দর্শক তাকে গ্রহণ করবে।

মহালয়ার ভোরে যখন ‘দেবী দূর্গতিহারিণী’ সম্প্রচার শুরু হয়, তখন থেকেই বাঙালি দর্শক রাগে ফেটে পড়ে। আকাশবাণীর অফিসে ফোনের পর ফোন আসতে থাকে, বাইরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে ভাঙচুর ও ইঁটবৃষ্টি শুরু হয়। মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সেই বছরই ষষ্ঠীর দিন পুনরায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ সম্প্রচার করে।

এই ঘটনায় উত্তম কুমার গভীরভাবে লজ্জিত হন। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন যে, তিনি এই কাজটি করতে চাননি। বাঙালির কাছে মহিষাসুরমর্দ্দিনী কতটা শ্রদ্ধার বিষয়, তা এই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়, যেখানে মহানায়ক উত্তম কুমারকেও তারা বর্জন করতে দ্বিধাবোধ করেননি। এই ঘটনাটি উত্তম কুমারের বর্ণময় কর্মজীবনের একমাত্র কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy