সলমন-ধোনি থেকে কান পর্যন্ত! বাঁকুড়ার মেয়ের জাদুকরি স্টাইলিংয়ে কাঁপছে বলিউড ও বিশ্বমঞ্চ

বলিউডের তাবড় মেগাস্টার সলমন খান, টাইগার শ্রফ থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্বের কিংবদন্তি সচিন তেন্ডুলকর, মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং বীরেন্দ্র সেহওয়াগ—ভারতের এই সমস্ত উজ্জ্বল তারকাদের স্টাইলিং ও পোশাক পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছে বাংলার এক মেয়ের ছোঁয়া। শুধু বলিউড নয়, সম্প্রতি ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবেও বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপুরি সিল্ক তথা বালুচরী শাড়িকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মঞ্চে তুলে ধরে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন কৃতি নারী পত্রলেখা মুখার্জী শি। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার সাধারণ এক কালীতলা গার্লস স্কুলের ছাত্রী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের অন্যতম পরিচিত ও সফল স্টাইলিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তাঁর এই অবিশ্বাস্য ও সংগ্রামের যাত্রা আজ গোটা জেলার পাশাপাশি সমগ্র রাজ্যবাসীর কাছে এক দারুণ গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাঁকুড়ার ঐতিহ্যবাহী এক শিক্ষা ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পত্রলেখা। তাঁর মা মুক্তি মুখার্জী ছিলেন বাঁকুড়ার কালীতলা গার্লস স্কুলের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা এবং বাবা চণ্ডীদাস মুখার্জী ছিলেন সোনামুখী কলেজের অধ্যক্ষ তথা জেলার একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। শৈশব ও কৈশোর থেকেই শিল্প, নান্দনিকতা, নন্দনতত্ত্ব এবং সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর এক গভীর ও আলাদা আকর্ষণ ছিল, যা তাঁকে পরবর্তীকালে অন্যান্য গতানুগতিক পেশার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক আকর্ষণীয় কেরিয়ার বেছে নিতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাঁকুড়ার মতো মফস্বল শহর থেকে উঠে এসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের আঙিনায় নিজের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার এই অনুপ্রেরণামূলক গল্প আজ দেশের বহু উদীয়মান তরুণ-তরুণীর কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের তীব্র বাসনা নিয়ে তিনি একসময়ে কলকাতা শহরে পা রেখেছিলেন। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ চার্চ কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ার পাশাপাশি তিনি স্বনামধন্য গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্টে ইন্ডিয়ান পেইন্টিং বা ভারতীয় চিত্রকলার ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ২০০০ সালে সফলভাবে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি জাতীয় স্তরের অত্যন্ত নামী প্রতিষ্ঠান যেমন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (NSD) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি (NIFT)-এ অতিথি অনুষদ বা ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো বড় ব্রেকটি আসে মুম্বইয়ের মায়ানগরীতে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি; বলিউডের একের পর এক শীর্ষস্থানীয় তারকার স্টাইলিং ও কস্টিউম ডিজাইনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নিজের অসাধারণ পেশাগত দক্ষতার এক জোরালো সাক্ষ্য রাখেন। এমনকি সুপরিচিত ‘পার্পল পিকচার্স’ প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গেও তিনি অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন।
তবে ফ্যাশন ডিজাইনিং বা স্টাইলিংয়ের গণ্ডিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি এই গুণী শিল্পী। নিজের বর্ণময় জীবনের সুদীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং নানা না-বলা গল্পকে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বইয়ের পাতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর রচিত ‘Stylist Whispers’ বইটি ফ্যাশন ও কস্টিউম স্টাইলিং জগতের পর্দার পেছনের নানা অজানা অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে পাঠক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলার বিখ্যাত বিষ্ণুপুরি সিল্ককে বিশ্বমঞ্চের আলোয় পৌঁছে দিয়ে তিনি আবারও জোরালোভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বাঁকুড়ার সাধারণ মাটি থেকে জন্ম নেওয়া স্বপ্নও সঠিক একাগ্রতা ও পরিশ্রমের জোরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমানভাবে উজ্জ্বল ও বিজয়ী হয়ে উঠতে পারে।