নীরব ঘাতক ব্রেইন অ্যানিউরিজম! কখন মারাত্মক রূপ নেয় এই রোগ? জেনে নিন লক্ষণ ও বাঁচার উপায়

যখন মস্তিষ্কের শিরার প্রাচীর বা রক্তনালীর দেওয়াল দুর্বল হয়ে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ব্রেইন অ্যানিউরিজম (Brain Aneurysm) বলা হয়। এই বিপজ্জনক সমস্যাটি বহু বছর ধরে মানবদেহে কোনো রকম উপসর্গ ছাড়াই অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে, কিন্তু এটি আকস্মিকভাবে ফেটে গেলেই মস্তিষ্কে ভয়াবহ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এটি মূলত স্ট্রোকের একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রূপ, যা দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা করানো না গেলে রোগীর জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে। নয়াদিল্লির সি কে বিড়লা হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের পরিচালক বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. কে কে জিন্দাল ব্যাখ্যা করে জানান যে, বেশিরভাগ মানুষই মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে পারেন না যে তারা এই নীরব ঘাতকের শিকার হয়েছেন, কারণ প্রাথমিকভাবে এর কোনো নির্দিষ্ট বা দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এই সুনির্দিষ্ট কারণেই এই রোগটিকে চিকিৎসকরা ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তবে অ্যানিউরিজমটি আকারে বৃদ্ধি পেলে এবং মস্তিষ্কের আশেপাশের স্নায়ুগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করলে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।
অ্যানিউরিজমটি ফেটে যাওয়ার আগের পর্যায়ে সাধারণত যে সমস্ত লক্ষণগুলো মানবশরীরে প্রকাশিত হতে পারে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম হলো মাথার যেকোনো একপাশে ক্রমাগত এবং অসহ্য ব্যথা অনুভব করা, চোখের পিছনে বা তার ঠিক উপরে তীব্র ব্যথা হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া কিংবা কোনো কিছু দ্বিমুখী বা ডাবল দেখা, চোখের একটি পাতা হঠাৎ ঝুলে পড়া, মুখের যেকোনো একপাশে অসাড়তা কিংবা দুর্বলতা অনুভূত হওয়া এবং চোখের তারার অস্বাভাবিক প্রসারণ ঘটা। তবে যদি অ্যানিউরিজমটি সম্পূর্ণ ফেটে যায়, তবে তা অবিলম্বে একটি অত্যন্ত জীবন-হুমকিপূর্ণ মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা জরুরি পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। এই চরম অবস্থার লক্ষণগুলোকে কখনোই কোনো অবস্থাতেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ফেটে যাওয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—হঠাৎ করে এমন এক তীব্র মাথাব্যথা যা জীবনে আগে কখনও অনুভূত হয়নি, ঘন ঘন বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, উজ্জ্বল আলো দেখলে চোখে তীব্র সমস্যা হওয়া, চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা বা অচেতন হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি হওয়া এবং শরীরের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশে হঠাৎ মারাত্মক দুর্বলতা কিংবা কথা বলতে চরম অসুবিধা দেখা দেওয়া। এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান ও জীবনদায়ী। চিকিৎসায় সামান্যতম বিলম্ব হলে রোগীর মস্তিষ্কের স্থায়ী ও অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, যা এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সমাজের কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ এই মারণ রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে প্রধানত অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা, যারা নিয়মিত সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্য ধূমপান করেন, যারা অতিরিক্ত পরিমাণে মদ্যপান করেন, যাদের পরিবারে বংশগতভাবে মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম বা স্ট্রোকের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে, যারা পলিসিস্টিক কিডনি রোগ বা বিশেষ কিছু জন্মগত জিনগত রোগে আক্রান্ত এবং চল্লিশ বছরের বেশি বয়সী মহিলারা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগটি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করার জন্য বেশ কিছু উন্নত পরীক্ষার সহায়তা নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিটি স্ক্যান, সিটি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা সিটিএ, এমআর অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা এমআরএ এবং ডিজিটাল সাবট্র্যাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা ডিএসএ-এর মতো আধুনিক ইমেজিং পরীক্ষা। এই রোগের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে অ্যানিউরিজমের সঠিক আকার, এর অবস্থান এবং ফেটে যাওয়ার প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রার ওপর। বর্তমান যুগে এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য চিকিৎসকরা মাইক্রোসার্জিক্যাল ক্লিপিং, এন্ডোভাসকুলার কয়েলিং অথবা ফ্লো-ডাইভার্টারের মতো অত্যন্ত আধুনিক ও যুগান্তকারী কৌশলগুলো সফলভাবে ব্যবহার করে আসছেন।
সব ধরনের মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম আগে থেকেই পুরোপুরি প্রতিরোধ করা চিকিৎসকদের পক্ষে সম্ভব না হলেও, সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি ফেটে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য বেশ কিছু সতর্কতামূলক নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, যেকোনো মূল্যে নিজের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরোপুরিভাবে ধূমপান বর্জন করতে হবে এবং তামাক থেকে দূরে থাকতে হবে। তৃতীয়ত, মদ্যপানের মাত্রা কঠোরভাবে কমিয়ে দিতে হবে। চতুর্থত, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে এবং প্রতিদিন নিয়ম করে শারীরিক ব্যায়াম বা যোগাসন করতে হবে। পরিশেষে, পরিবারের কোনো সদস্যের যদি অতীতে এই রোগের ইতিহাস থেকে থাকে, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত সময়ে সময়ে স্ক্রিনিং ও পরীক্ষা করাতে থাকা উচিত, যাতে সময়মতো এই নীরব ঘাতককে প্রতিহত করা সম্ভব হয়।