সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গের রহস্যজনক মৃত্যুর দীর্ঘ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও, অবশেষে এই মামলার আইনি জট কাটতে শুরু করল। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের লাজারাস দ্বীপে উত্তর-পূর্ব ভারত উৎসবে (NEIF) যোগ দিতে গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হয় জনপ্রিয় এই গায়কের। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল পুরো অসম। জনরোষের মুখে পড়ে সিআইডি-র অধীনে সিট (SIT) গঠন করে শুরু হয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত। মঙ্গলবার সেই বহুল আলোচিত মামলার প্রেক্ষিতে বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টের বিচারক শর্মিলা ভূঁইয়া ৭ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন করেছেন।
বিচারক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত অভিযোগ পড়ে শোনালে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ‘নির্দোষ’ বলে দাবি করেন। পাবলিক প্রসিকিউটর (PP) জিয়াউল কামার জানিয়েছেন, আদালত অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এখন থেকে আর কোনো অতিরিক্ত শুনানির অবকাশ থাকবে না। সরাসরি সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। আগামী ৮ জুন থেকে দৈনিক ভিত্তিতে সাক্ষী শোনার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। প্রসিকিউশনকে দ্রুত পূর্ণ সাক্ষীর তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে, যাতে আদালতের পক্ষ থেকে তাদের সমন পাঠানো যায়।
তদন্তে যে সাতজন অভিযুক্তের নাম উঠে এসেছে, তারা জুবিন গর্গের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সিঙ্গাপুরের NEIF-এর প্রধান আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত, জুবিনের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা, ব্যান্ড সদস্য শেখর জ্যোতি গোস্বামী ও অমৃত প্রভা মহন্ত, জুবিনের আত্মীয় তথা অসম পুলিশের ডিএসপি সন্দীপন গর্গ এবং দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নন্দেশ্বর বরা ও প্রবীণ বৈশ্য। ভারতীয় দণ্ডবিধির (BNS) বিভিন্ন ধারায় তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অবহেলায় মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশেষত শ্যামকানু মহন্তের বিরুদ্ধে ৮টি এবং সিদ্ধার্থ শর্মার বিরুদ্ধে ৭টি ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। শ্যামকানুর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী পরিচিতি—প্রাক্তন ডিজিপি ভাস্কর জ্যোতি মহন্তের ভাই এবং গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ননী গোপাল মহন্তর ভাই হওয়ার বিষয়টিও এই মামলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
এদিকে, এই মামলার একটি বিপরীতধর্মী দিকও রয়েছে। সিঙ্গাপুর পুলিশের পৃথক তদন্তে খুনের কোনো প্রমাণ মেলেনি। সেদেশের কোরোনার আদালতের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, জুবিন গর্গ অতিরিক্ত মদ্যপান করেছিলেন এবং লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই জলে নামার ফলে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন। তবে সেই রিপোর্টকে পুরোপুরি মেনে নিতে রাজি নন শিল্পীমহল ও তাঁর অগণিত ভক্তরা। তাদের দাবি, মৃত্যুর নেপথ্যে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এখন ভারতের বিশেষ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে সেই রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হবে কি না, তা নিয়ে গোটা দেশের নজর এখন ৮ জুনের দিকে। জুবিন ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, কবে মিলবে সেই মর্মান্তিক দিনের প্রকৃত সত্য।





