দেশভাগের রক্তাক্ত ক্ষত আজও কি তাড়া করে? কলকাতায় পা রেখেই বিস্ফোরক সানি দেওল!

১৯৪৭-এর দেশভাগের সেই ভয়াবহ ও মর্মস্পর্শী ইতিহাসকে সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে আসছে সানি দেওল অভিনীত এবং রাজকুমার সন্তোষী পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’ (Batwara 1947)। আগামী ১৪ অগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির ঠিক আগে ছবির জোরদার প্রচারে ব্যস্ত পুরো টিম। আর সেই প্রচারপর্বের অংশ হিসেবেই এবার খাস কলকাতায় পা রাখলেন তা

রকা অভিনেতা সানি দেওল এবং পরিচালক রাজকুমার সন্তোষী। শহরের ধনধান্য স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সানি দেওল এমন কিছু বিস্ফোরক ও আবেগঘন স্মৃতিচারণ করলেন, যা শুনে শিউরে উঠেছে গোটা দেশ।

এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার সময় সানি দেওলের পরনে ছিল একটি কালো শার্ট, যার বুকে স্পষ্ট অক্ষরে খোদাই করা ছিল, ‘ম্যাঁয় জিন্দা হুঁ’। তাঁর কথাতেও বারবার ফিরে এল সেই সময়ের ইতিহাস, যার গভীর ক্ষত আজও অজস্র পরিবারের মানসপটে দগদগে হয়ে রয়েছে। দ্য ওয়ালের পক্ষ থেকে যখন সানিকে প্রশ্ন করা হয় যে, দেশভাগের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলির মধ্যে পাঞ্জাব এবং বাংলার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এবং দুই রাজ্যের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও এমন কোনও সাধারণ যন্ত্রণা কি রয়েছে যা পাঞ্জাব ও বাংলাকে একই সূত্রে বেঁধে দেয়?—তখন সানি অত্যন্ত সংবেদনশীল জবাব দেন।

সানি দেওলের দ্ব্যর্থহীন উত্তর ছিল, দেশভাগকে কোনও একটি নির্দিষ্ট রাজ্য বা জনগোষ্ঠীর সংকীর্ণ ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর আসল বেদনা ও নৃশংসতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, সেদিন আসলে একটি অখণ্ড দেশের সেই অংশটিই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, যার কোটি কোটি মানুষকে রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে এদিক-অদিক চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কে কোন জাতের, কোন সম্প্রদায়ের কিংবা কোন অঞ্চলের মানুষ, তা আর এতটুকুও গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছিল অজস্র সুখের পরিবার, মানুষ রাতারাতি ঘরছাড়া হয়েছিল এবং পৈশাচিক হিংসায় প্রাণ হারিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ।

তবে মৃত্যুর বিভীষিকাকেও ছাপিয়ে সানির মতে দেশভাগের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল নিজের চিরচেনা শেকড় ও ঘর হারানোর যন্ত্রণা। যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় শান্তিতে বসবাস করে আসছিলেন, তাঁদের আচমকা সবকিছু ফেলে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে অস্তিত্বের লড়াই শুরু করতে হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার আগে দেশের সাধারণ মানুষ একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বাধীন ভারত অর্জনের সেই আনন্দের অপেক্ষায় থাকা সহজ-সরল মানুষগুলির সামনে সেদিন হঠাৎই দেশভাগের নিষ্ঠুর বাজি এসে উপস্থিত হয়।

সানির মতে, দেশভাগের অর্থই ছিল একটি পরিবারের ভিতকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিবারই এমন চরম পরিস্থিতির কথা কখনও কল্পনা করতে পারে না। এমনকি যারা সেই সময় ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন যে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেই তাঁরা আবার নিজেদের আসল ভিটামাটিতে ফিরে যেতে পারবেন। আর সেই কারণেই অনেকেই নিজেদের সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারেননি, বরং কেউ কেউ ঘরের কোণায় অত্যন্ত যত্নে জিনিসপত্র লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন।

দেশভাগের সেই ব্যক্তিগত ও নিদারুণ ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন সানি দেওল। সম্প্রতি তিনি অমৃতসরের ঐতিহাসিক দেশভাগ জাদুঘরে গিয়েছিলেন। সেখানে মানুষের ফেলে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন, মলিন চিঠি, পুরনো ছবি, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী এবং সেই দুর্দিনেও প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নানা প্রচেষ্টার অবিনশ্বর দলিল রক্ষিত রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে গিয়ে অভিনেতা জানান, তিনি সেখানে একটানা দু’ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন এবং পুরো বিষয়টির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে ডুবে গিয়েছিলেন।

তাঁর মতে, এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কারণ এমন অমানবিক ঘটনা যেন ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোথাও আর কখনও পুনরাবৃত্ত না হয়, সেটাই তাঁর একমাত্র কামনা। সানি জোর দিয়ে বলেন যে, দেশভাগকে শুধু ধর্ম, জাতি কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনের সংকীর্ণ চোখে বিচার করলে এর আসল মানবিক দিকটি সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার করুণ গল্প এবং অদম্য মানবতার ইতিহাস।

সানি বিশ্বাস করেন যে, মানুষ যদি একটু বিবেচনা, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা নিয়ে চলতে শেখে, তাহলে কখনোই অন্য মানুষকে আলাদা করে দেখার বা ঘৃণা করার প্রয়োজন পড়ে না। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই শান্তি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে বাঁচতে চায়। আর ঠিক সেই কারণেই সাধারণ দর্শকের কাছে ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’-এর মতো ছবি দেখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ইতিহাসের এমন একটি ভয়াবহ অধ্যায়কে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায় পড়া আর তার নির্মম মানবিক অভিঘাতকে অন্তরে অনুভব করা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।

বিশেষ করে, দেশভাগের সঙ্গে সানি দেওলের নিজের পারিবারিক ইতিহাসেরও গভীর যোগ রয়েছে। তাঁর কাছে এই ইতিহাস শুধুই কোনো বাণিজ্যিক সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নিজের ঠাকুরদা-ঠাকুমার মুখে তিনি সেই সময়ের নানা রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনা শুনে বড় হয়েছেন। সানি জানান, টানা প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে তিনি প্রতি বছর নিয়ম করে দু-তিন মাস গ্রামের বাড়িতে কাটাতেন। সেখানে পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা একসঙ্গে গোল হয়ে বসে অতীতের সেই ভয়াল দিনের কথা আলোচনা করতেন। শিশু বয়সে তিনি চুপচাপ একপাশে বসে সেই গল্পগুলি শুনতেন, আর সেই অমূল্য স্মৃতিগুলি ধীরে ধীরে তাঁর মনের গভীরে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল।

সেই শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি এক বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ঠাকুমা সেই অশান্ত ও হিংসাত্মক সময়ে এক যুবতী মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন। চারপাশে তখন চরম নৈরাজ্য ও মানুষের মধ্যে তীব্র হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই ভয়াল অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মানুষ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সানি জানান, তাঁর ঠাকুমা সেই মেয়েটিকে ঘরের ভেতর নিরাপদে লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং পরের দিন সকালে তাঁর ঠাকুরদা নিজে হাতে ঝুঁকি নিয়ে সেই মেয়েটিকে নিরাপদে তার নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন।

আজও এমন বহু রোমহর্ষক ও মানবিক গল্প সানির স্মৃতিতে নিখুঁতভাবে জীবন্ত হয়ে রয়েছে। তাঁর প্রবল বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের দর্শক এবং বিশেষ করে শিশুরা যখন প্রেক্ষাগৃহে এই ছবি দেখবে, তখন তারা শুধু ১৯৪৭ সালের একটি ঐতিহাসিক দলিল দেখবে না। তারা বুঝতে পারবে যে সংকট ও বিপর্যয়ের মুহূর্তে কীভাবে একটি পরিবার সব বাধা পেরিয়ে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং একসঙ্গে সমস্ত প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে।

ফলে, ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’ সিনেমাটি সানি দেওলের কাছে নিছক কোনো প্রথাগত ছবি নয়, বরং বহু পরিবারের বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে চলা স্মৃতির সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার এক ঐতিহাসিক মাধ্যম। পাঞ্জাব থেকে বাংলার এই পুণ্য মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর কথায় বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে এক চিরন্তন প্রশ্ন—দেশভাগ কি সত্যিই ১৯৪৭ সালে চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল? নাকি ঘর হারানো মানুষের চোখের জল, পরিবার হারানোর তীব্র যন্ত্রণা আর মানুষের প্রতি মানুষের চরম অবিশ্বাসের মাঝে সেই বিভাজনের কোনো কালো ছায়া আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে রয়েছে? হয়তো সেই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইতিহাসের এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে আজ আবার নতুন করে ফিরে তাকানো অত্যন্ত জরুরি।