আরজি কর কাণ্ডে বিরাট নির্দেশ হাইকোর্টের! সিবিআইকে কড়া ডেডলাইন দিয়ে কোন বড় বার্তা দিল আদালত?

আরজি কর হাসপাতালের চিকিৎসক-পড়ুয়ার মর্মান্তিক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তের পরিধি ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে বড়সড় আইনি পদক্ষেপ নিল কলকাতা হাইকোর্ট। শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সিবিআইকে আগামী মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত সম্পূর্ণ করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মামলার সম্পূর্ণ শুনানি এদিন অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার কক্ষে (ইন ক্যামেরা) অনুষ্ঠিত হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আইনজীবী ও শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মামলাকারী পক্ষ ছাড়া অন্য কাউকেই এদিন আদালত কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এদিনের এই বিশেষ শুনানিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে মামলার সার্বিক তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হয়। ওই রিপোর্টে সিবিআই উল্লেখ করেছে যে, নির্যাতিতার পরিবার শুরু থেকে যাদের যাদের জিজ্ঞাসাবাদের জোরালো দাবি জানিয়েছিল, তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে মোট ১৬ জন সন্দেহভাজনকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে চার জন চিকিৎসক ছাড়াও ঘটনার দিন রাতে হাসপাতালে চিকিৎসকের জন্য খাবার সরবরাহকারী সেই ডেলিভারি বয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে তদন্ত প্রক্রিয়া গুটিয়ে আনতে আরও চার সপ্তাহ সময় প্রার্থনা করা হয়েছিল। কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চ সেই আর্জি খারিজ করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তদন্ত শেষ করতে হবে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর এই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। আইনি মহলের ধারণা, ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতিরা এই মামলার বিপুল পরিমাণ তথ্যপ্রমাণ, গোপনীয় নথি এবং চার্জশিটের ভারে ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন, তাই সিবিআইয়ের বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত এবার খুব শীঘ্রই একটি দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ জুন আরজি করের এই নৃশংস ঘটনায় সিবিআইকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ এবং বিচারপতি শম্পা সরকারের বিশেষ বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাতে ডিনারের সময় থেকে শুরু করে পরদিন শ্মশানে নির্যাতিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নতুন করে তদন্ত করতে হবে। সিবিআই ইতিপূর্বে আদালতে একটি স্টেটাস রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছিল যে, এই হাই-প্রপ্রাইল মামলার তদন্তের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন দল গঠন করা হয়েছে। গত ২১ মে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সিবিআইয়ের জয়েন্ট ডিরেক্টরের (ইস্টার্ন জোন) নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT) এই মামলার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। নির্যাতিতার পরিবার শুরু থেকেই তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং প্রমাণের অভাবে ধোঁয়াশা নিয়ে যে সমস্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল, আদালত সেই প্রতিটি বিষয় নতুন করে তদন্তের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়।

তদন্ত প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এবং পরিবারকে সন্তুষ্ট করতে এর মধ্যে গত ৩১ জুলাই এই মামলার একেবারে সূর্যাঙ্ক থেকে তদন্তের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সিবিআই আধিকারিক সীমা পহুজাকে সরিয়ে নতুন তদন্তকারী অফিসার হিসেবে মেধাবী আধিকারিক সন্দীপনী গর্গকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিহত তরুণী চিকিৎসকের বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরেই তদন্তের শ্লথ গতি এবং সঠিক অগ্রগতির অভাব নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের অনুরোধের ফলেই তদন্তকারী অফিসার বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। স্মরণ করা যেতে পারে, গত ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট সকালে আরজি কর হাসপাতালের চার তলার সেমিনার রুম থেকে ওই কৃতি পড়ুয়া-চিকিৎসকের ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিনই অত্যন্ত তড়িঘড়ি ও রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর দেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে এই ঘটনায় একাধিক নতুন আইনি মোড় নেয় এবং রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এখনও পর্যন্ত এই চাঞ্চল্যকর মামলায় হাসপাতালের মূল অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে শিয়ালদা আদালত। গত বছর ২০ জানুয়ারি বিচারক অনির্বাণ দাস তাকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কঠোর সাজা শোনান এবং পাশাপাশি ১৭ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেন।