আকাশে ছোঁয়া গ্রামে বাস! অক্সিজেনের অভাবে যেখানে হতে পারে মৃত্যু, সেখানে কীভাবে বেঁচে আছেন মানুষ?

চার মাস আগে ইউটিউবে মুক্তি পাওয়া কনিষ্ক গুপ্তার একটি অসাধারণ ভ্লগ বর্তমানে ইন্টারনেট দুনিয়ায় রীতিমতো ঝড় তুলেছে। ‘ইন্ডিিয়াস ভিলেজ ক্লোজেস্ট টু দ্য স্কাই’ শিরোনামের এই ভিডিওটি ইতিমধ্যে ৪০ লাখেরও বেশি ভিউ কুড়িয়ে নিয়েছে এবং এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। এই ভিডিওটিতে কনিষ্ক তুলে ধরেছেন হিমাচল প্রদেশের দুর্গম স্পিতি উপত্যকায় অবস্থিত এমন এক গ্রামের রোমহর্ষক ও রহস্যময় গল্প, যার নাম শুনলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আমরা কথা বলছি কোমিক গ্রামের কথা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই জনপদটিকে কেবল ভারতেরই নয়, গোটা পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ গ্রাম বলে গণ্য করা হয়। এখানকার জীবনযাত্রা আদতে অত্যন্ত কঠিন ও নির্মম। তীব্র ঠান্ডায় হাড়ে কাঁপুনি ধরে, গাছের কোনো নামগন্ধ নেই এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় অর্ধেক।
ভিডিওটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো, এখানকার মানুষ শুধু বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন না, বরং অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে নিজেদের জীবন কাটাচ্ছেন। কনিষ্ক নিজেই জানিয়েছেন যে কোমিক গ্রামে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর নিজের অক্সিজেন লেভেল মারাত্মকভাবে কমে ৮০-তে নেমে এসেছিল। সমতল ভূমিতে কারো রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এতটা নেমে গেলে তাঁকে সরাসরি হাসপাতালের ভেন্টিলেটরে রাখার প্রয়োজন পড়ে। অথচ কোমিক গ্রামের বাসিন্দারা জন্মজন্মান্তর ধরে ঠিক এই পরিবেশেই বসবাস করে আসছেন। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলতে গেলে, পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কারণে এখানকার মানুষের রক্তে রেড ব্লাড সেল বা লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তাই সামান্য অক্সিজেনের উপস্থিতিতেও তাঁরা একটুও ক্লান্ত না হয়ে পাহাড়ি চড়াই উতরাই ভেঙে দিব্যি ক্ষেতে কাজ করতে পারেন।
এই বরফাবৃত মরুভূমিতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা এক অদ্ভুত ও তাক লাগানো দেশি জুগাড় বা কৌশল ব্যবহার করেন। এখানকার বাড়িগুলির দেওয়াল দুই ফুট চওড়া মাটি দিয়ে তৈরি, যা ঘরের ভেতরের অমূল্য উষ্ণতা বাইরে যেতে দেয় না এবং বাইরের প্রখর রোদ প্রতিফলিত করার জন্য বাড়ির দেওয়াল সাদা রঙে রাঙানো থাকে। যেহেতু এই উচ্চতায় কোনো গাছ জন্মায় না, তাই জ্বালানির জন্য কাঠ পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এর বিকল্প হিসেবে গ্রামের মানুষ যম, গরু ও গাধার শুকিয়ে যাওয়া গোবর ‘বুখারি’ নামক বিশেষ চুল্লিতে জ্বালান। এই অভিনব উপায়েই তাঁদের ঘর গরম থাকে এবং রান্নার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়। শীতের মৌসুমে তীব্র ঠান্ডার কারণে জলের পাইপ পর্যন্ত জমে পাথর হয়ে যায়, তাই সেখানে প্রচলিত শৌচাগার বা টয়লেট কাজ করে না। পরিবর্তে তারা ড্রাই টয়লেট ব্যবহার করেন এবং সেখান থেকে উৎপাদিত বর্জ্য পরবর্তীতে কৃষি জমির উর্বরতা বাড়ানোর কাজে চমৎকার দেশি সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রাতের বেলা যখন চরম প্রাণঘাতী ঠান্ডা নামে, তখন মানুষ নিজেদের গবাদি পশুদেরও ঘরের ভেতরে উষ্ণ আশ্রয়ে নিয়ে আসেন। এই হিমশীতল পরিবেশে খাওয়ার জলের উৎস হিসেবে কাজ করে একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ হিমবাহের ধারা, যা মাটির নিচ থেকে প্রবাহিত হয় এবং কখনোই জমে যায় না। এখানকার বিখ্যাত খাবারের মধ্যে অন্যতম হলো ‘চিরুল’, যা যবের ছাতুর সঙ্গে খাঁটি গরুর ঘি, পনির এবং মিষ্টি মিশিয়ে তৈরি করা একটি ঘন পেস্ট। এটি খাওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শরীরে প্রচণ্ড শক্তির জোগান দেয়। স্পিতি উপত্যকার এই দুর্গম অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে মনে হবে যেন আপনি অন্য কোনো ভিনগ্রহে চলে এসেছেন। তীব্র বাতাস ও জলের স্রোত পাথরের বুক চিরে এমন সব অদ্ভুত আকৃতি তৈরি করেছে যা দূর থেকে দেখলে চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠদেশ বলে মনে হতে পারে।
কোমিক গ্রাম থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত লাংজা গ্রাম, যেখানকার মাটি খুঁড়লে আজও কোটি কোটি বছর আগের সামুদ্রিক জীবের ফসিল বা জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এটি এই অকাট্য সত্যেরই প্রমাণ দেয় যে বর্তমানের যে জায়গায় সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে একসময় বিশাল টেথিস সাগর অবস্থান করত। পাশাপাশি, ঠিক পাশেই রয়েছে ২০ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ‘চাউ চাউ কাং নিল্ডা’ পাহাড়, যাকে স্থানীয় বাসিন্দারা সাক্ষাৎ ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ বলে মনে করেন। কারণ এই পাহাড়ের বরফগলা জলধারাই পুরো এলাকার জীবনরেখা। এখান থেকে সামান্য দূরেই রয়েছে হিক্কিম গ্রাম, যেখানে বিশ্বের সর্বোচ্চ পোস্ট অফিস অবস্থিত। বিগত ৪০ বছর ধরে কোনো ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাড়াই এই দুর্গম জনপদটি গোটা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার বিপুল ঘাটতি থাকলেও এখানকার মানুষের মন অত্যন্ত উদার। কোমিক গ্রামে মাত্র ১২-১৩টি ঘরের বসতি, কিন্তু কোনো একটি পরিবারেও যদি কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান হয়, তবে পুরো গ্রামের মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। বরফের মতো ঠান্ডা জলে হাত দিয়ে বাসন মাজার হাত থেকে বাঁচতে তাঁরা ফানেল, পাইপ ও কাঠের টুকরো দিয়ে অভিনব এক দেশি গিজারও বানিয়ে নিয়েছেন।