বাঁহাতে চিনচিনে ব্যথা মানেই কি হার্ট অ্যাটাক? কোন কোন লক্ষণ দেখলে এক মুহূর্তও দেরি করবেন না?

বায়ে হাতে ব্যথা হওয়া অত্যন্ত সাধারণ একটি শারীরিক সমস্যা বলে মনে করেন অনেকেই। ভুল ভঙ্গিতে শোয়া, দৈহিক ক্লান্তি বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল ভেবে অনেকেই এই লক্ষণটিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ব্যথাকে অবহেলা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বহু ক্ষেত্রেই এই ধরনের শারীরিক অস্বস্তি হাড়, পেশি বা স্নায়ুর জটিল সমস্যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাঁহাতের এই ব্যথা সরাসরি হৃদরোগ বা আসন্ন হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক এবং মারাত্মক সতর্কবার্তা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে যদি এই ব্যথা হঠাৎ করেই শুরু হয় এবং তার সঙ্গে তীব্র শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঠান্ডা ঘাম হওয়া, বুকে প্রচণ্ড চাপ বা ভারী ভাব অনুভব করা, বমি ভাব কিংবা চোয়াল ও পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে এটিকে সাধারণ ব্যথা ভেবে ভুল করলে চলবে না। এটি একটি স্পষ্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে এবং এমন পরিস্থিতিতে কালক্ষেপ না করে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া আবশ্যক। অন্যদিকে, যদি ব্যথাটি প্রধানত ঘাড় বা গলা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে হাতের আঙুল পর্যন্ত নেমে যায় এবং তার সঙ্গে হাত অবশ হয়ে যাওয়া বা ঝিনঝিন করার মতো অনুভূতি থাকে, তবে তার নেপথ্যে সার্ভিকাল রেডিকুলোপ্যাথি বা নার্ভ বাধার মতো সমস্যা থাকতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনে এই ধরনের ব্যথার পেছনে নানা ধরনের কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে প্রধানত পেশির টান, জয়েন্টে আঘাত, মেরুদণ্ডের সমস্যা এবং নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার মতো বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দুর্ঘটনা, পতন বা খেলাধুলোর সময় হাতে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তার পরপরই সেখানে তীব্র ফোলাভাব, অসহ্য ব্যথা, হাত নাড়াতে অসুবিধা কিংবা হাতের আকার বদলানোর মতো লক্ষণ দেখা যায়, তবে হাড় ভেঙে যাওয়ার বা ফ্র্যাকচারের জোরালো আশঙ্কা থাকে। ফাটল বা ফ্র্যাকচারের ক্ষেত্রে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং যথাযথ চিকিৎসা ছাড়া তা নিজে থেকে ঠিক হয় না।
এছাড়াও, সার্ভিকাল স্পন্ডিলোসিস বা স্লিপ ডিস্কের সমস্যায় ঘাড়ের মেরুদণ্ডে থাকা ডিস্কগুলি স্থানচ্যুত হয়ে স্নায়ুর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে ব্যথা শুধুমাত্র ঘাড়ে সীমাবদ্ধ না থেকে বাহু, কাঁধ এবং আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগীই এই সমস্যায় হাতের পেশিতে দুর্বলতা বা অবশ ভাবের শিকার হন। অন্যদিকে, জিম বা ব্যায়ামের সময় অতিরিক্ত ভারী ওজন তোলা, একটানা একই ধরনের কাজ করা কিংবা হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি লাগার কারণে পেশি ও লিগামেন্টে মারাত্মক টান ধরতে পারে। সাধারণত এই ধরনের পেশির ব্যথার ক্ষেত্রে নড়াচড়া করলে বা কাজ করলে কষ্ট বাড়ে, তবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে ধীরে ধীরে তা উপশম হয়।
হৃদরোগের ক্ষেত্রে বাঁহাতের ব্যথার মূল কারণ হলো হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডের পেশিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ না হওয়া। শরীরের স্নায়ুগুলির একটি অভিন্ন পথ থাকার কারণে এই তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতি কেবল বুকের মাঝখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বাম কাঁধ, বাহু, চোয়াল, ঘাড় এবং পিঠের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও সব ধরনের হার্ট অ্যাটাকে বাঁহাতে ব্যথা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও যদি এই ব্যথা বুকে প্রচণ্ড চাপ বা আকস্মিক জাঁকুনির সঙ্গে অনুভূত হয়, তবে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পরিশেষে বলা যায়, সব সময় বাঁহাতের ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ না হলেও এটি কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। সঠিক কারণ চিহ্নিত করে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তাই শরীরের এই সংকেতগুলির প্রতি সর্বদা সতর্ক থাকুন।