“১৫ আগস্ট স্বাধীনতা পেলেই নামবে বিপর্যয়!”- কোন বড় বিপদের কথা বলেছিলেন জ্যোতিষীরা?

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছিল ভারত। স্বাধীনতার আনন্দে যখন গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখন এই ঐতিহাসিক দিনটি ঘিরে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমহর্ষক ও কমচর্চিত অধ্যায়। ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ১৫ আগস্ট তারিখটি চূড়ান্ত করলেও, ভারতের জ্যোতিষীরা তা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, এই বিশেষ দিনটি দেশের জন্মলগ্নের জন্য একেবারেই শুভ নয়। আর জ্যোতিষীদের সেই আপত্তির কারণেই শেষ পর্যন্ত এক অভিনব সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল, যার হাত ধরেই জন্ম নেয় মধ্যরাতের ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

কেন ১৫ আগস্ট বেছে নিয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন?

ব্রিটিশ শাসনের একেবারে অন্তিম লগ্নে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন প্রথমে ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতবিরোধ, পাকিস্তানের জোরালো দাবি এবং বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক হিংসার জেরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।

এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই মাউন্টব্যাটেন নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেন এবং ঘোষণা করেন যে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হবে। এই তারিখটি বেছে নেওয়ার নেপথ্যে তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দও কাজ করেছিল। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক ল্যাপিয়েরের ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ (Freedom at Midnight) বই অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট ছিল জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে থাকা মাউন্টব্যাটেনের কাছে এই দিনটি এশিয়ায় এক নতুন যুগের সূচনার প্রতীক ছিল।

জ্যোতিষীদের আপত্তি এবং অশুভ যোগের আশঙ্কা

ভাইসরয়ের এই ঘোষণার পরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জ্যোতিষীরা নিজেদের গণনা শুরু করেন। বারাণসী, দক্ষিণ ভারত ও কলকাতার জ্যোতিষীদের প্রধান আপত্তি ছিল দিনটিকে ঘিরে। তাঁদের মতে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার, যা একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্য একেবারেই অনুকূল ছিল না। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তাঁর ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’ (India After Gandhi) বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে জ্যোতিষীদের কাছে রোববারের পাশাপাশি শুক্রবারও অশুভ দিন হিসেবে বিবেচিত হতো।

কলকাতার জ্যোতিষী স্বামী মদনানন্দ ১৫ আগস্টের জন্য একটি বিশেষ জ্যোতিষচক্র তৈরি করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন ভারতের ওপর মকর রাশির প্রভাবের পাশাপাশি শনির কুপ্রভাব এবং রাহুর অশুভ অবস্থান থাকবে। এই মর্মে তিনি মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করে জানান যে, ওই দিন স্বাধীনতা দিলে দেশে বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যার মতো মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

তারিখ বদলানো গেল না, এল মধ্যরাতের সমঝোতা

ততক্ষণে মাউন্টব্যাটেন প্রকাশ্যে ১৫ আগস্টের ঘোষণা করে ফেলায় এবং দেশভাগের প্রক্রিয়া বহুদূর এগিয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে দিন বদলানো আর সম্ভব ছিল না। এই জটিল পরিস্থিতিতে জ্যোতিষীরা একটি বিকল্প প্রস্তাব দেন। তাঁদের মতে, ১৪ আগস্ট তারিখটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শুভ।

দুই পক্ষের এই টানাপোড়েনের মাঝে শেষ পর্যন্ত একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমঝোতার পথ বের করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে তারিখ ১৫ আগস্টই রাখা হবে, কিন্তু ক্ষমতার হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক মুহূর্তটি হবে ঠিক মধ্যরাতে।

এই সমঝোতার অংশ হিসেবেই ১৪ আগস্ট রাতে ভারতের গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশন বসে, যা গড়ায় মধ্যরাত পর্যন্ত। ১৪ আগস্টের রাত পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটায় যখন ১৫ আগস্ট শুরু হয়, তখনই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর বিখ্যাত ‘Tryst with Destiny’ ভাষণ দিয়ে বলেন যে, মধ্যরাতের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভারত জীবন ও স্বাধীনতার পথে জেগে উঠবে। এইভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ভাইসরয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং জ্যোতিষীদের আপত্তির এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে ১৫ আগস্টের মধ্যরাত ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।