যে মিষ্টির প্যাঁচে কাবু গোটা দেশ, জানেন কি আমাদের অতি প্রিয় জিলিপির আসল আদি নিবাস কোথায়?

গরম, মুচমুচে জিলিপিতে একটা কামড় বসানোর সময় কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই সুস্বাদু মিষ্টির আসল উৎপত্তি কোথায়? আপাতদৃষ্টিতে জিলিপি ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে হলেও, এর প্রাচীনতম ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে এই উপমহাদেশের সীমানার বাইরে। পশ্চিম এশিয়ায় মূলত ‘জালাবিয়া’ বা ‘জুলাবিয়া’ নামেই এই ভাজা মিষ্টির আদি প্রচলন ছিল।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে জানা যায়, দশম শতাব্দীর আরবি রান্নার বই ‘কিতাব আল-তাবিখন’-এ প্রথম এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা সংকলন করেছিলেন ইবন সায়ার আল-ওয়াররাক। পরবর্তীকালে ত্রয়োদশ শতকেও মুহাম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদির বইতে জালাবিয়ার বিশদ বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আজকের জিলিপি সরাসরি বিদেশ থেকে ভারতে আমদানি হয়েছে। বরং এই মিষ্টির পুরো ইতিহাসটিই এক দারুণ অভিযোজনের গল্প।

শত শত বছর ধরে পশ্চিম এশিয়ার এই মিষ্টি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের এক আলাদা পরিচিতি তৈরি করে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ‘জালাবিয়া’ শব্দটি থেকেই বাংলায় ‘জিলিপি’ বা অন্যান্য অঞ্চলে ‘জিলেবি’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। ভারতে এর প্রথম সাহিত্যিক উল্লেখ পাওয়া যায় জিনাসুরের লেখা ‘প্রিয়মকর্ণৃপকথা’ নামক একটি জৈন গ্রন্থে, যা প্রায় ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ের। একজন বণিকের নৈশভোজের বিবরণে এই মিষ্টির কথা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে পঞ্চদশ শতকের মধ্যেই ভারতে এর বেশ ভালোই কদর তৈরি হয়েছিল।

আজকের জিলিপি পুরোপুরি ভারতীয় রন্ধনশৈলীর শতবর্ষের বিবর্তনের ফল। সাধারণত ময়দার গোলা গরম তেল বা ঘিয়ে ভেজে চিনির রসে ডুবিয়ে এটি তৈরি করা হলেও, অঞ্চলভেদে এর রেসিপি, পুরুত্ব ও পরিবেশন পদ্ধতিতে প্রচুর বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন, বাংলায় ‘জিলিপি’ বলতে নানান প্রস্তুতি বোঝায়—খাঁটি ছানা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু ‘ছানার জিলিপি’, আবার অনেক জায়গায় মুগ ডাল দিয়ে তৈরি হয় ‘মুগ জিলিপি’ বা ‘পাপড়ি’। এ ছাড়াও বিউলির ডাল দিয়ে তৈরি ফুলের মতো দেখতে ‘হমরতি’ বা ইমৃতির রূপ তো রয়েছেই।

এককথায়, জিলিপিকে কোনো একটি মাত্র দেশের মিষ্টি বলে গণ্ডিবদ্ধ করে দিলে এর দারুণ ও দীর্ঘ ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। তথ্যপ্রমাণ বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় এর শিকড় থাকলেও, বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় রাঁধুনি, হালুইকর এবং সাধারণ মানুষের হাত ধরে এই রসে ভরা প্যাঁচ এমন এক রূপ নিয়েছে যা আজ সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজস্ব।