ইতিহাস কি ভুলে গেল নজরুল-গুরুর অবদান? সিহাড়শোল রাজ স্কুলের ধুলোমাখা পাতায় এক মহান বিপ্লবীর গল্প

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যেমন বেণীমাধব দাস ছিলেন, তেমনই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিমন্ত্রে’র দীক্ষাগুরু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী নিবারণচন্দ্র ঘটক। অথচ আজ কালের আবর্তে সেই মহান শিক্ষক ইতিহাসের পাতায় প্রায় বিস্মৃত। রানিগঞ্জের সিহাড়শোল রাজ হাইস্কুলে শিক্ষকতার আড়ালে যিনি বপন করেছিলেন স্বাধীনতার বীজ, সেই নিবারণচন্দ্রের জীবনকথা আজও বাঙালির কাছে এক অমীমাংসিত অধ্যায়।
পশ্চিম বর্ধমানের কয়লা ও রেল শিল্পের কেন্দ্রস্থল রানিগঞ্জের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিহাড়শোল রাজ হাইস্কুল। এখানেই ম্যাট্রিকুলেশনের ছাত্র থাকাকালীন নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন নিবারণচন্দ্র। গবেষক গুণময় ফৌজদারের মতে, নিবারণচন্দ্র ছিলেন এই অঞ্চলের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী। হুগলি মহসিন কলেজে পড়ার সময়ই তিনি বিপ্লবী বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে এসে ‘যুগান্তর’ দলে যোগ দেন। ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিতে তিনি বিপিনবিহারীকে ছদ্মনামে সিহাড়শোল রাজ এস্টেটে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন, যাতে স্কুলের আড়ালে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক ও যুবকদের স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করার কাজ নির্বিঘ্নে চলে।
রডা কোম্পানির বিখ্যাত অস্ত্র লুঠের ঘটনায় নিবারণচন্দ্রের ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি স্বয়ং গাড়োয়ান সেজে অস্ত্র পরিবহণ করে গুপ্ত সমিতিগুলোতে পৌঁছে দিতেন। তাঁর মাসি দুকড়ি বালাদেবী—যিনি দক্ষিণবঙ্গের প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত—তাঁদের পরিবার ছিল বিপ্লবের আঁতুড়ঘর। কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর নিবারণচন্দ্র তাঁর শিক্ষকতার চাকরি আর ফিরে পাননি। শেষ জীবনে তিনি বীরভূমের দিকে চলে যান, কিন্তু তাঁর ছাত্র নজরুলের মনে যে আগুন তিনি জ্বালিয়েছিলেন, তা চিরকাল অমর হয়ে রইল।
নজরুল নিজেই এক চিঠিতে স্বীকার করেছিলেন, “মাস্টার মশাই, আমি যদি সৃষ্টি হই, আপনি তবে স্রষ্টা।” সিহাড়শোল রাজ হাইস্কুলের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নজরুল এখানে শিক্ষালাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ধূমকেতু পত্রিকায় নজরুলের কবিতা প্রকাশ এবং তাঁর কারাবাস—সবই যেন সেই মাস্টারমশাইয়ের শিখিয়ে দেওয়া স্বদেশ প্রেমেরই ফসল। আলিপুর জেলে থাকাকালীন নজরুল যখন ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ রচনা করেন, তখন হয়তো তাঁর মন পড়ে থাকত সিহাড়শোলের সেই শ্রেণিকক্ষেই।
সিহাড়শোল রাজ হাইস্কুলে বর্তমানে নিবারণচন্দ্র ও নজরুলের মূর্তি স্থাপন করা হলেও, দুকড়ি বালাদেবীর মতো অনেক বিপ্লবীর কোনো স্মারক আজও নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাপসকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বর্তমান প্রজন্ম নজরুল ও নিবারণচন্দ্রের আদর্শকে বুকে ধারণ করেই মুক্তমনা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে। টালির ছাউনি দেওয়া সেই পুরনো ঘর আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি রাস্তার নামকরণে কি শহিদের প্রকৃত সম্মান রক্ষা হয়? নাকি জন্মভিটে আর সংগ্রামের এই স্মৃতিচিহ্নগুলোকে হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করাই হবে প্রকৃত দেশপ্রেম? ইতিহাস আজও সেই উত্তরের অপেক্ষায়।