হু হু করে চড়ছে তেলের দাম! আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির আগুন দরে পকেট পুড়বে ভারতীয়দের?

আন্তর্জাতিক বাজারে ফের লাগামছাড়াভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে কাঁচা তেলের দাম। গত সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপিছু ৮৭.৭২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। টানা তিন দিন ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দামে এই ক্রমাগত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মঙ্গলবার, ১১ অগস্টের এশীয় বাজারের প্রাথমিক লেনদেনের শুরুতেও সেই একই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম খুব শীঘ্রই ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এই রেকর্ড বৃদ্ধির নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ইরান-নীতি। তেহরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেট অফ হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী ফের সম্পূর্ণরূপে খুলে যাওয়ার তীব্র অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালীতে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নতুন শর্ত চাপানোর জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিজের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, বিগত দিনের বিভিন্ন সংঘর্ষে মার্কিন তরফের নিহতদের পরিবারের জন্য ইরানকে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আগামী দিনে তেহরানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় তাঁর দেশের প্রতিনিধিরা এই ক্ষতিপূরণের দাবি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরবেন। অন্যদিকে, বসে নেই ইরানও। তেহরানের পক্ষ থেকেও উলটো সুরে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি যুদ্ধক্ষতিপূরণের দাবি তুলে জোরালো সওয়াল করা হচ্ছে।
এই বিশাল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক জটিল কূটনৈতিক জাঁতাকল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত ওই তহবিলের বিষয়টি গত জুন মাসে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের সময়কার একটি ১৪ দফা সমঝোতা চুক্তির অংশ ছিল। ফলে একদিকে আমেরিকার অনমনীয় মনোভাব এবং অন্যদিকে ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষতিপূরণের দাবিতে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও বেশি ঘোরালো হয়ে উঠেছে। এই পুরো কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে সবচেয়ে বড় সংকট ও প্রশ্নচিহ্ন হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেই হরমুজ প্রণালী।
ইতিমধ্যেই ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, হরমুজের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, তা নিয়ে বর্তমানে ইরান ও ওমানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন প্রধান বন্দরগুলির উপর থেকে তাদের কঠোর নৌ অবরোধ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ পুরোপুরি খোলা সম্ভব নয় বলে তেহরান তাদের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। তেহরানের এই কঠোর মনোভাবের সরাসরি প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকারী পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজগুলির উপর পড়তে শুরু করেছে।
খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও বাজার গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান অমৃতা সেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন মাত্র পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে। অথচ গত জুন মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই সংখ্যাটি দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪টিতে উন্নীত হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ কিংবা সীমিত পরিসরে চালু থাকলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মজুত ও সরবরাহের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। সরবরাহ নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে পারে।
আর এই গোটা পরিস্থিতি ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি খরচও স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমার কোনো আশার আলো তো তৈরি হয়ই না, উপরন্তু দেশের ভেতরে পরিবহন খরচ ও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালী নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের এই দীর্ঘমেডায়ী সংঘাত যত প্রলম্বিত হবে, বিশ্ব বাজারে তেলের অস্থিরতা তত বাড়বে—যার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক আঁচ শেষপর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ ভারতীয় মধ্যবিত্তের পকেটে।