উৎসবের মরশুমের আগেই কি কমবে চিনির দাম? আখের বদলে অন্য বিকল্পে ভরসা রেখে বড়সড় নীতি বদলের পথে কেন্দ্র!

দেশের বাজারে চিনির দাম হু হু করে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোয় এবার সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে বড় পদক্ষেপের কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী অক্টোবর মাস থেকে শুরু হতে চলা নতুন চিনি মরশুমে ইথানল উৎপাদনের জন্য আখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর লাগাম টানার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূলত চিনির উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে জোগান স্বাভাবিক করা এবং আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাই সরকারের এই বিরাট নীতি বদলের মূল লক্ষ্য।

সরকারি ও শিল্পমহল সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের মতো দেশের প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলিতে এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়নি। বৃষ্টির এই ব্যাপক ঘাটতির কারণে আগামী মরশুমে দেশজুড়ে চিনির মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যার ফলে আগামী দিনে খোলা বাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ার তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইথানল তৈরির প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে সীমিত করে চিনির উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চাইছে কেন্দ্র।

চলতি মরশুমে, যা আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সমাপ্ত হতে চলেছে, দেশের বিভিন্ন চিনিকল প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি সরাসরি ইথানল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করেছে। এটি দেশের মোট উৎপাদিত চিনির প্রায় ১০ শতাংশ। এমতাবস্থায় আগামী মরশুমে ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহার কমিয়ে আনা হলে বাজারে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফলস্বরূপ, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো রাজ্যে কম বৃষ্টির কারণে উৎপাদন কমলেও বাজারে চিনির সম্ভাব্য ঘাটতি অনেকটাই সফলভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্র।

ইতিমধ্যেই দেশের খুচরা বাজারে চিনির দাম গত এক মাসের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দাম বর্তমানে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। একদিকে বাজারে চিনির জোগান তলানিতে ঠেকেছে, অন্যদিকে সামনেই একাধিক উৎসবের মরশুম থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চিনির চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আগামী দিনে চিনির দাম আরও লাগামছাড়াভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা রোধ করতেই সরকার এই জরুরি পদক্ষেপের কথা চিন্তা করছে।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেশের সমস্ত চিনিকলগুলিকে আখের রস এবং বি-হেভি মোলাসেস ব্যবহার করে ইথানল উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, বি-হেভি মোলাসেস হলো চিনি তৈরির সময় প্রাপ্ত একটি উপজাত, যাতে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে চিনির উপাদান থাকে। তবে চিনি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অবশিষ্ট সি-হেভি মোলাসেস থেকে ইথানল তৈরির অনুমতি বহাল রাখা হতে পারে।

তবে আখ থেকে ইথানল উৎপাদন কমিয়ে আনা হলে সরকারের সামনে অন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। কারণ, পেট্রোলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে, তা পূরণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আখ থেকে কম ইথানল উৎপাদনের ফলে যে ঘাটতির সৃষ্টি হবে, তা মেটানোর জন্য ভুট্টা বা চাল থেকে ইথানল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দিকে নজর দিতে পারে কেন্দ্র। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, বর্তমানে দেশের গুদামগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভুট্টা ও চালের মজুত রয়েছে।

চিনির ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এর আগেও একাধিক কঠোর পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। বর্তমানে চিনির রফতানির উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। পাশাপাশি গত মাসে ব্যবসায়ীদের গুদামে সর্বোচ্চ কত পরিমাণ চিনি মজুত রাখা যাবে, তার উপর নির্দিষ্ট সীমাও আরোপ করা হয়েছে। বাজারে চিনির সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে খুব শীঘ্রই আরও কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ জারি করার প্রস্তুতি চলছে। অর্থাৎ, একদিকে পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা এবং অন্যদিকে দেশের বাজারে চিনির আগুন দাম নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন কেন্দ্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী মাসের শেষের দিকে ইথানল উৎপাদনে আখ ব্যবহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে।