৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সাহস দেখাল ইরান! ট্রাম্পের হুঙ্কারে কি তবে বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে গেল?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও একবার তুঙ্গে উঠেছে, যখন আমেরিকার সদ্য প্রাক্তন ও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে আসা একটি বিরাট আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবিকে সরাসরি এবং অত্যন্ত জোরালো ভাষায় খারিজ করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিকতম এই তীব্র সংঘর্ষের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে আকাশছোঁয়া অংকের দাবি পেশ করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই দাবি মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তেহরানের ওপর বড় রকমের পালটা আর্থিক ও নৈতিক জবাবদিহিতার বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার হুংকার ছেড়েছেন। তাঁর স্পষ্ট দাবি, উল্টো তেহরানকেই আমেরিকার কাছে বড় অংকের আর্থিক তওয়ান দিতে হবে এবং অতীতে তাদের মদতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হামলায় নিহত ও আহত মার্কিন নাগরিকদের রক্ত ও জীবনের সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী ওয়াশিংটনের কাছে বিগত সংঘর্ষের জেরে হওয়া কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির জন্য মোট ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আটকে থাকা বা বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ইরানি সম্পত্তি অবিলম্বে অবমুক্ত করারও দাবি তোলা হয়েছে। অত্যন্ত কৌশলী ও আক্রমণাত্মক কায়দায় তেহরান এই সমস্ত দাবিগুলোকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল জ্বালানি তেল পরিবহনের রুট—হোরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) সম্পূর্ণভাবে আবার খুলে দেওয়ার বা চালু রাখার চুক্তির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, কৌশলগত সমুদ্রপথ স্বাভাবিক করার শর্ত হিসেবে তারা এই মোটা অংকের অর্থ হাতাতে চাইছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশালে (Truth Social) নিজের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই বহুমুখী দাবিগুলোকে অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে একটি “অত্যন্ত হাস্যকর ও কৌতূহলজনক আইডিয়া” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, ভবিষ্যতে তেহরানের সঙ্গে যদি কোনো কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্তরে কোনো ধরনের আলোচনা হয়, তবে তিনি এই দাবির বিপরীতে আরও কঠোর ও কঠিন প্রতি-দাবি বা কাউন্টার ডিমান্ড টেবিলের ওপর রাখবেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানি প্রতিনিধিরা মূলত বিগত পাঁচ মাসের দীর্ঘ সামরিক সংঘর্ষে তাদের যে অপূরণীয় আর্থিক ও সামরিক ক্ষতি হয়েছে, তারই ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চাইছে। তবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এই সর্বনাশা সংঘাতের মূল সূত্রপাত হয়েছিল তখনই, যখন তেহরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবি অগ্রাহ্য করে তাদের গোপন পরমাণু কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের জেদ ছাড়তে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। স্মরণ করা যেতে পারে যে, এই মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিল।
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বলেন যে, তেহরানের উল্টো আমেরিকার কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কোনো নৈতিক অধিকারই নেই। বরং এর উল্টোটা হওয়া উচিত। অতীতে তেহরানের মদতে বা সরাসরি যুক্ত থাকা বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী হামলায় যেসব মার্কিন সেনা ও সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন, সেই সমস্ত পরিবারগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মূল দায়ভার একমাত্র ইরানেরই। তিনি তাঁর এই বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ২০০০ সালে ঘটে যাওয়া মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল (USS Kol) এর ওপর ভয়াবহ বোমা হামলার মর্মান্তিক ঘটনার কথা। এ ছাড়াও তিনি বিগত ২০২০ সালে ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় তাঁরই সরাসরি হোয়াইট হাউস আদেশে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত তৎকালীন ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান ও সর্বময় কর্তা জেনারেল কাসেম সোলাইমানির প্রসঙ্গও অত্যন্ত কড়া ভাষায় টেনে আনেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধু ক্ষতিপূরণ এড়ানো নয়, বরং অতীতে যাদের জীবন ধ্বংস হয়েছে, সেই সমস্ত নিরপরাধ মানুষের রক্তের হিসেব তেহরানকে এক দিন কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতেই হবে।