সঙ্গীতের মাঝে মৃত্যুর শীতল সত্য! ভ্রমণের ব্যাগে কাফনের কাপড় নিয়ে ঘোরেন ৬৭ বছরের লাকি আলি?

মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে সাধারণ মানুষ সবসময়ই এক অজানা অস্বস্তি ও ভয়ের মুখোমুখি হন। কিন্তু কিংবদন্তি গায়ক লাকি আলি বরাবরই নিজের জীবন, সঙ্গীত এবং দর্শনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সম্প্রতি একটি লাইভ পারফরম্যান্সের সময় হঠাৎ করেই মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠে আসতেই ৬৭ বছর বয়সি এই জনপ্রিয় গায়ক এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা মুহূর্তের মধ্যে তাঁর লক্ষ লক্ষ শ্রোতাকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। কনসার্টের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে জানান যে তিনি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং ভ্রমণে বের হলেই তিনি সর্বদা নিজের সঙ্গে কাফনের কাপড় সঙ্গে রাখেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর জাদুকরী কণ্ঠ শ্রোতাদের জীবনের নানা সুখ-দুঃখের মুহূর্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে তাঁর স্বতন্ত্র গায়কী এবং স্বাধীনভাবে গান তৈরির অভিনব ভঙ্গি তাঁকে ভারতীয় সংগীতে এক অনন্য পরিচিতি দিয়েছিল। সেই লাকি আলি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে অকপটে ঘোষণা করেন যে একদিন এই পৃথিবী থেকে সকলকেই চিরবিদায় নিতে হবে, তখন তাঁর সেই কথার মধ্যে জীবনের প্রতি এক গভীর ও নির্মম সত্যের প্রকাশ ঘটেছে।

অনুরাগীদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি তাঁদের অটুট টান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গায়ক আরও জানান যে, তিনিও তাঁর শ্রোতাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। তবে মৃত্যুর কথা প্রকাশ্যে এনে তিনি কাউকে আতঙ্কিত বা প্রস্তুত করতে চাননি, বরং নিজের জীবনদর্শন থেকেই তিনি এই অনিবার্য সত্যটিকে সহজভাবে মেনে নিয়েছেন। শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, তিনি যখনই দেশ-বিদেশে ভ্রমণে যান, তাঁর ব্যাগে সর্বদা ‘ইহরাম’ বা কাফনের কাপড়টি মজুত থাকে। তাঁর সরল বক্তব্য ছিল, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস যেখানেই আসুক না কেন, তাঁকে যেন সেই স্থান থেকেই শান্তিতে চলে যেতে দেওয়া হয়। মঞ্চে লাকি আলির এই অপ্রত্যাশিত ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের পর সমগ্র কনসার্ট চত্বরের পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। তাঁর গান শুনতে আসা শ্রোতা ও ভক্তদের চোখেমুখে তখন বিষাদের গাঢ় ছাপ ও গভীর আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপস্থিত এক প্রবীণ অনুরাগী জানান যে, তিনি গত প্রায় ৩০ বছর ধরে লাকি আলির গান শুনে বড় হয়েছেন এবং এত বছর পরেও তাঁর জাদুকরী কণ্ঠের জাদু থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। শৈশব থেকে বর্তমানের এই দীর্ঘ যাত্রার সম্পর্কের কথাই যেন গোটা মুহূর্তটিকে আরও বেশি ভারী ও স্মরণীয় করে তোলে।

পরবর্তীতে সেই আবেগঘন কনসার্টের একটি বিশেষ মুহূর্তের ভিডিও গায়ক নিজেই তাঁর অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে শেয়ার করেন। ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং ভক্তদের কমেন্টে উপচে পড়ে কমেন্ট বক্স। কেউ নস্টালজিয়ায় ভেসে গিয়ে নিজের কৈশোরের সোনালী দিনগুলিতে ফিরে যান, আবার কেউ গায়কের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। একজন আবেগপ্রবণ অনুরাগী লিখেছেন যে, তিনি এই নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিতে সম্পূর্ণ নারাজ। তাঁর কাছে লাকি আলি এখনও সেই নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগের তরুণ গায়ক, যাঁকে ছোটবেলায় দূরদর্শনের পর্দায় গান গাইতে দেখা যেত। অন্য এক ভক্ত তাঁর এই গভীর বিশ্বাসের প্রশংসা করে লিখেছেন যে, ভ্রমণের সময় ইহরাম সঙ্গে রাখার সিদ্ধান্ত তাঁর আধ্যাত্মিক ও অন্তরের বিশ্বাসের এক অনন্য পরিচয়। পাশাপাশি তিনি প্রার্থনা করেছেন, সর্বশক্তিমান যেন গায়ককে একটি দীর্ঘ, সুস্থ ও সুন্দর জীবন দান করেন। সুর, খ্যাতি, সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের সব বেড়াজাল পেরিয়ে লাকি আলির এই জীবনদর্শন প্রমাণ করে যে, জীবনের অন্তিম সত্যকে আলিঙ্গন করার মানসিকতাই প্রকৃত শিল্পীকে অমর করে রাখে।