আবাস যোজনার উপভোক্তাদের জন্য বিরাট উপহার! মাত্র ১২০০ টাকায় মিলবে ১০০ সিএফটি বালি!

পূর্ব বর্ধমান জেলায় সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অভিযোগের অবসান ঘটিয়ে বালির অস্বাভাবিক ও লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল জেলা প্রশাসন। সোমবার পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক শ্বেতা আগরওয়ালের সরাসরি নেতৃত্বে জেলাশাসকের নিজস্ব দফতরে বালি সংক্রান্ত দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এক দীর্ঘ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জেলার বিশিষ্ট বিধায়করা, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকবৃন্দ এবং জেলার সমস্ত বৈধ বালি খাদানের ইজারাদাররা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভাতারের বিধায়ক সৌমেন কার্ফা আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নির্ধারিত বালির দামের তালিকা ঘোষণা করেন এবং প্রশাসনের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন।

বিধায়ক সৌমেন কার্ফা জানান যে, বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান জেলাজুড়ে মোট ৬১টি বৈধ বালি খাদান রয়েছে। তবে বর্ষার চলতি মরসুম চলায় সরকারি নিয়ম মেনে বর্তমানে সমস্ত বালি খাদান বা ঘাট থেকে বালি তোলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু জেলাবাসীর সুরক্ষায় এবং উন্নয়নে স্বস্তি আনতে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বালি ইজারাদারদের কাছে এই মুহূর্তে প্রায় ৩ কোটি কিউবিক ফুট (সিএফটি) বালি মজুত রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তরফে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেশ করা হয়েছে। এই মজুত থাকা পর্যাপ্ত বালি সাধারণ মানুষ এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের ঠিকাদাররা নির্দিষ্ট ও সুলভ মূল্যে কিনতে পারবেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চালান এবং লোডিং খরচ-সহ প্রতি ১০০ সিএফটি বালির দাম কঠোরভাবে ৫,২৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর সঙ্গে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গ্রাহককে আলাদাভাবে বহন করতে হবে। অন্যদিকে, অত্যন্ত গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণার্থে ‘আবাস যোজনা’ প্রকল্পের আওতায় বাড়ি তৈরির জন্য উপভোক্তারা অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ১,২০০ টাকা মূল্যে প্রতি ১০০ সিএফটি বালি কিনতে পারবেন, যেখানেও পরিবহন খরচ পৃথক থাকবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত এই নির্ধারিত সরকারি দর সমগ্র জেলায় কঠোরভাবে কার্যকর থাকবে। বর্ষার মরসুম সমাপ্ত হওয়ার পর যখন ফের নতুন করে বালি খাদানগুলি চালু হবে, তখন বাজারে বালির স্বাভাবিক সরবরাহ পুনরুদ্ধার হবে এবং দাম আরও হ্রাস পাবে বলে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা যৌথভাবে আশা প্রকাশ করছেন।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে জেলার নির্দিষ্ট কোন কোন জায়গায় বালি মজুত রয়েছে, সেই স্টোরেজ পয়েন্টগুলির একটি সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত তালিকা খুব শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। প্রকাশিত ওই তালিকায় মজুত থাকা বালির নির্দিষ্ট জায়গার সঠিক ঠিকানা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির যোগাযোগের ফোন নম্বরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কোনো রকম মধ্যস্বত্বভোগীর দালালি ছাড়াই সরাসরি নির্ধারিত সরকারি মূল্যে বালি সংগ্রহ করতে সক্ষম হবেন। যদিও বালির খুচরা বাজারদর নিয়ে প্রশাসনের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিধায়ক সৌমেন কার্ফা। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য, ‘‘খুচরা বাজারে কে কত দরে বালি বিক্রি করবেন, সেই বিষয়টি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’’ তবে বৈঠকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে বালি বিক্রি করা হলে ইজারাদারদেরই তার সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং তাঁদের মাধ্যমেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিধায়কের কথায়, “নির্ধারিত দর না মানলে পুলিশ গিয়ে সরাসরি কাউকে আটক করবে না, কিন্তু ইজারাদাররাই নিজেদের স্বার্থে অতিরিক্ত মুনাফাবাজদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবেন।”

উল্লেখ্য, গত তিন মাস ধরে লাগাতার বালির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, মাত্র তিন মাস আগেও যেখানে এক ট্রাক্টর বালির বাজারদর ছিল প্রায় ৪ হাজার টাকার কাছাকাছি, তা পরবর্তীতে আকাশছোঁয়া হয়ে সরাসরি ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছিল। এর ফলে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের নিজেদের স্বপ্নের বাড়ি তৈরি এবং অন্যান্য জরুরি নির্মাণকাজের খরচ এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, বালি ব্যবসায়ীদের সাফ বক্তব্য ছিল যে, বর্ষার মরসুমের কারণে নদী থেকে বালি উত্তোলণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রতি বছরই সরকারি নিয়ম মেনে বর্ষার নির্দিষ্ট মাসগুলিতে বালি তোলা বন্ধ রাখা হয়। চলতি বছরেও গত ১০ জুলাই থেকে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত খাদানগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন যে, ১৫ নভেম্বরের পর পুনরায় নদী থেকে বালি তোলা শুরু হলে বাজারে জোগান দ্রুত বাড়বে এবং লাগামহীন বাজারদর স্বাভাবিক হয়ে আসবে।