যুদ্ধের জেরে থমকে গেছে বিশ্ব বাণিজ্য! দীর্ঘমেয়াদে আটকে থাকা জাহাজগুলো কীভাবে ডেকে আনছে সামুদ্রিক প্রলয়?

ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি এক বিশাল পরিবেশগত সংকটের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। প্রণালীর জলপথ বন্ধ থাকায় হরহামেশা এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও, দীর্ঘসময় ধরে হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজের অলস ও থমকে থাকা অবস্থানের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশে যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, সে বিষয়টি এতদিন সম্পূর্ণ আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে যে, ফারাস উপসাগর বা আরব সাগরের বুকে দীর্ঘকাল ধরে নোঙর করে থাকা প্রায় ১,৫০০-র বেশি বাণিজ্যিক জাহাজের তলদেশে বা হালের (Hulls) গায়ে মারাত্মক ক্ষতিকর সামুদ্রিক ‘বায়োফাউলিং’ বা জৈব-আবরণী প্রজাতি দ্রুত জমা হতে শুরু করেছে, যা গোটা পৃথিবীর সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ অশনি সঙ্কেত।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী, এই বিশাল জলপথ বা প্রণালীটি যখন ভবিষ্যতে পুনরায় উন্মুক্ত হবে, তখন এই অলস দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজগুলো তাদের গন্তব্যের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বন্দরে পৌঁছে যাওয়ার সময় এই আক্রমণাত্মক ও ভিনদেশি জীবদের অজান্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক স্তরে সামুদ্রিক জৈব-নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিরাট ও অনিয়ন্ত্রিত ‘সুপার-স্প্রেডার’ ঘটনা ঘটে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই সমস্ত বিদেশি সামুদ্রিক উদ্ভিদ, পরজীবী প্রাণী, ক্ষতিকারক অণুজীব এবং রোগব্যাধির অবাধ বিস্তার স্থানীয় প্রাকৃতিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, দেশীয় বন্য মাছের প্রজাতি, বাণিজ্যিক মৎস্যচাষ বা অ্যাকুয়াকালচার স্টক এবং তটসংলগ্ন বিভিন্ন শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে শুধু যে পরিবেশগত ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট হবে তা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতেও নেমে আসতে পারে অপূরণীয় ধস।

অবশ্য শিপিং বা সামুদ্রিক বাণিজ্যে অচলাবস্থার জেরে জাহাজ আটকে থাকা এবং তার জেরে বায়োফাউলিংয়ের মারাত্মক সমস্যা তৈরি হওয়ার ঘটনা অতীতেও দুয়েকবার ঘটেছে, তবে সেগুলি এত দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক জাহাজের ট্রাফিক বিশ্ব বাণিজ্যের মূল জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত ‘চोक পয়েন্ট’-এর সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে ২০টি পয়েন্টের ক্ষেত্রে বিকল্প রুট বা জলপথের সহজ সুযোগ রয়েছে, যার ফলে জাহাজগুলো সামান্য পথ ঘুরিয়ে বা বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজগুলোকে বসিয়ে রাখার পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সারা বিশ্বে মাত্র ৪টি এমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্ট রয়েছে যাদের কোনো বিকল্প জলপথ বা রুট নেই—সেগুলি হলো হরমুজ প্রণালী, বাটিক সাগরের ওরেসান্ড প্রণালী, কৃষ্ণ সাগরের বসফরাস ও ডারদানেলস প্রণালী এবং বোহাই সাগরের বোহাই প্রণালী।

এদিকে কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রেও উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। গত শনিবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আমেরিকা নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও নীতিতে সংশোধন না আনা পর্যন্ত কৌশলগত হরমুজ প্রণালী কোনোভাবেই উন্মুক্ত করা হবে না। এর মাধ্যমে তেহরান আন্তর্জাতিক জলপথের উন্মুক্তকরণ ও সামুদ্রিক যাতায়াতকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সমঝোতামূলক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে অত্যন্ত কঠোর ও নতুন কিছু পূর্বশর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এবং প্রভাবশালী রেভোলিউশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জুলঘদ্রের একটি অত্যন্ত বিস্ফোরক ও কড়া বক্তব্য ব্যাপকভাবে সম্প্রচারিত হয়েছে। সেই বক্তব্যে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে ইরানবিরোধী হুমকিমুলক মনোভাব চিরতরে ত্যাগ করতে হবে এবং একইসঙ্গে ইরান ও এই গোটা অঞ্চলে তেহরানের সমস্ত সশস্ত্র মিত্রদের বিরুদ্ধে চলা আগ্রাসী যুদ্ধকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। এর আগে অবশ্য তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ওমানের সঙ্গে যৌথ সীমানায় অবস্থিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওমান সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তারা।