হিন্দু রাষ্ট্র হলে সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনবে ভারতে! ডঃ আম্বেদকরকে উদ্ধৃত করে বিস্ফোরক দাবি কর্ণাটকের মন্ত্রীর!

ভারতের সংবিধান প্রণেতা ডঃ বি আর আম্বেদকরের ঐতিহাসিক সতর্কবাণী ও দর্শনকে হাতিয়ার করে সরাসরি হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের দাবির তীব্র সমালোচনা করলেন কর্ণাটকের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী যতীন্দ্র সিদ্দারামাইয়া। গত ৬ আগস্ট বিদরের চন্নবসবা পট্টদেবরু থিয়েটারে অনুষ্ঠিত ‘কর্ণাটক শোষিত সম্প্রদায় মহাসম্মেলন’-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, এক শ্রেণির সাম্প্রদায়িক শক্তির মূল লক্ষ্যই হলো ধর্মের জিগির তুলে সাধারণ মানুষকে জাত ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জোরালো দাবি জানান যে, কোনোভাবেই ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়, বরং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিমণ্ডলেই ধর্মকে সীমাবদ্ধ রাখা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

সম্মেলনের মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী যতীন্দ্র সিদ্দারামাইয়া ডঃ বি আর আম্বেদকরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি তুলে ধরে উপস্থিত জনতাকে সতর্ক করে বলেন যে, যদি ভবিষ্যতে এই ধর্মনিরপেক্ষ দেশ কোনো দিন ভুলবশত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর রূপ নেয়, তবে তা হবে এই জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়। তিনি উপস্থিত শোষিত ও বঞ্চিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, যারা ধর্মের অস্ত্রকে অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ ও মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। যখন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিভাজনকারী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব, কেবল তখনই আমরা আমাদের প্রকৃত সাংবিধানিক অধিকার ও শক্তির সন্ধান পাব।

হিন্দু ধর্মের অন্তর্নিহিত কাঠামো ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী আরও বলেন যে, ভারতের বুকে প্রচলিত প্রাচীন ও কঠোর বর্ণাশ্রম তথা জাতিপ্রথার প্রধান মূল উৎসই হলো ধর্ম। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, বর্তমান হিন্দু ধর্মের রীতিনীতিতে জাতিভেদ প্রথা অত্যন্ত গভীরভাবে শিকড় গেঁথে রয়েছে, যা সমাজকে শতভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন যে, যদি পুনরায় দেশে সেই ধরনের চরম রক্ষণশীল ও একপেশে ব্যবস্থা ফিরে আসে, তবে দেশের প্রতিটি নাগরিককে ফের ভয়াবহ সামাজিক শোষণ ও বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হবে। সেই পরিস্থিতিতে দেশে কোনো প্রকৃত সংখ্যালঘু সমাজ সুরক্ষিত থাকবে না এবং সংখ্যালঘুদের চরম অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে জীবন কাটাতে বাধ্য হতে হবে।

ভারতকে তথাকথিত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার দাবিকে সরাসরি আক্রমণ করে মন্ত্রী বলেন যে, এর অর্থ আর কিছুই নয়, বরং সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সেই প্রাচীন ও নির্মম শোষণের ব্যবস্থাকেই পুনরায় জাঁকিয়ে বসার লাইসেন্স দেওয়া। তিনি তীব্র ভাষায় অভিযোগ করেন যে, কিছু নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য এবং সমাজে স্থায়ী ফাটল ধরাতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ডাক দিয়ে তিনি জানান যে, যাঁরা ধর্মের অপব্যবহার করে সমাজকে টুকরো টুকরো করতে চাইছে, তাঁদের প্রতিহত না করলে কখনোই প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, মহাত্মা বুদ্ধ, সমাজ সংস্কারক বাসবেশ্বর, ডঃ বি আর আম্বেদকর এবং কবি কনকদাসের মতো মহান মনীষী ও সমাজ সংস্কারকদের অবিরাম নেতৃত্বে শত শত বছর ধরে দেশে শক্তিশালী সামাজিক সংস্কার আন্দোলন চললেও এখনও পর্যন্ত ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে এই জাতিভেদ প্রথাকে জিইয়ে রাখা হয়েছে। তিনি বেদ ও শাস্ত্রের বিভিন্ন প্রথার প্রসঙ্গ টেনে অভিযোগ করেন যে, ধর্মীয় অনুশাসন ও বিশেষ কিছু শ্লোকের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে আজও সমাজে বৈষম্য টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে সোচ্চার হতে হবে।