রুপোলি পর্দার চিত্রনাট্য হার মানবে! পিছিয়ে পড়েও সোনা জয় অস্মিতার, তবুও কেন আইনি জটিলতায় চ্যাম্পিয়ন?

কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে দেশের হয়ে জুডোতে প্রথম সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন অস্মিতা দে। গ্লাসগোর ম্যাটে তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যে গোটা দেশ গর্বিত। তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে অপ্রত্যাশিত বিতর্ক। উত্তরপ্রদেশ সরকারের নতুন এবং কঠোর নিয়মাবলীর জেরে তিনি দেড় কোটি টাকার বিশাল আর্থিক পুরস্কার পাবেন কি না, তা নিয়ে বর্তমানে তৈরি হয়েছে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন। একাধিক আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে চ্যাম্পিয়ন এই অ্যাথলিটের পুরস্কারপ্রাপ্তি এখন সম্পূর্ণ বিশ বাঁও জলে।

গ্লাসগোয় মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগের রোমাঞ্চকর ফাইনালে অস্মিতার সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিলেন কানাডার শক্তিশালী জুডোকা হেইডি কোয়াচ। ম্যাচের শুরুতেই মারাত্মক চাপে পড়ে যান ২৩ বছর বয়সি এই ভারতীয় কন্যা। একটি ‘ইউকো’ হজম করার পাশাপাশি তাঁর জুটেছিল পেনাল্টিও। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গিয়েছিল কানাডিয়ান তারকার হাতের মুঠোয়। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না ত্রিপুরার কৃতি সন্তান অস্মিতা। দারুণ লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে তিনি ম্যাটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের চিত্রনাট্য লেখেন। দীর্ঘ চার মিনিটের বাউটের ঠিক মাঝপথে চোখধাঁধানো আগ্রাসনে স্কোর ১-১ সমতায় ফেরান তিনি।

নির্ধারিত সময়ের তীব্র লড়াই ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পরেও আর কোনো প্রতিযোগী পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে ম্যাচ গড়ায় টানটান উত্তেজনার ‘গোল্ডেন স্কোর’ বা সাডেন ডেথ পর্বে। এই বিশেষ নিয়মে যিনি প্রথম পয়েন্ট অর্জন করবেন, তিনিই বিজয়ী ঘোষিত হন। আর ঠিক এখানেই বাজিমাত করেন অস্মিতা। চরম স্নায়ুর চাপকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি আরেকটি অত্যন্ত মূল্যবান ‘ইউকো’ আদায় করে নেন। এর ফলেই ভারতের ঝুলিতে আসে কমনওয়েলথ জুডোর প্রথম ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক।

তবে এই দুর্দান্ত সাফল্যের আনন্দ কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে গেছে পুরস্কার সংক্রান্ত জটিলতায়। অস্মিতার জন্ম ও প্রাথমিক বেড়ে ওঠা ত্রিপুরায় হলেও, দীর্ঘকাল ধরে তিনি জুডোর ম্যাটে উত্তরপ্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। এমনকি ২০২৩ সাল থেকে তিনি ইউপি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও আসল সমস্যা তৈরি করেছে ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে যোগীরাজ্যের ক্রীড়া মহলে আনা একটি নতুন সরকারি নির্দেশিকা। সেই নিয়মের বেড়াজালে আটকে এখন নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন এই সরকারি নির্দেশিকার শর্তগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজ্যের আর্থিক পুরস্কার পেতে হলে কোনো অ্যাথলিটকে মূলত তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, তাঁকে আবশ্যিকভাবে উত্তরপ্রদেশের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজ্যের কোনো স্বীকৃত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দু’বছর পড়াশোনা করার পোক্ত রেকর্ড থাকা বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে রাজ্যের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।

অস্মিতার ক্ষেত্রে এই শর্তগুলি পুরোপুরি পূরণ করা বেশ দুরূহ। কারণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি উত্তরপ্রদেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে লড়লেও, জন্মসূত্রে তিনি সে রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা নন। ফলে দেড় কোটি টাকার বিশাল নগদ পুরস্কার তিনি শেষ পর্যন্ত আদৌ পাবেন কি না, তা নিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে বিস্তর আলোচনা ও সংশয় ঘনিয়েছে।

এই পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকা নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুলেছেন উত্তরপ্রদেশের ক্রীড়া অধিকর্তা আরপি সিং। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ অংশগ্রহণকারী এবং পদকজয়ী সমস্ত অ্যাথলিটদের একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই অবিশ্বাস্য লড়াই চালিয়ে এই তরুণী যেভাবে পিছিয়ে থেকেও কানাডিয়ান প্রতিপক্ষকে ধূলিসাৎ করেছেন, তা তাঁর লৌহদৃঢ় মানসিকতারই চরম পরিচায়ক। ঐতিহাসিক এই সাফল্যের পর দেশের এই তারকা জুডোকার পুরস্কার সংক্রান্ত জট কবে পুরোপুরি কাটে, আপাতত সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশের ক্রীড়ামহল।