শেয়ার বাজারে বড়সড় ওলটপালট! LIC-র শেয়ার বিক্রি করে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ঘরে তুলল মোদী সরকার!

ভারতীয় জীবন বিমা নিগম বা এলআইসি (LIC) সংস্থায় নিজেদের মালিকানাধীন প্রায় ৬.৫ শতাংশ শেয়ার সফলভাবে বিক্রি করে দিল কেন্দ্রীয় সরকার। মূলত সরকারি কোষাগারে তহবিল সংগ্রহের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই শেয়ার বাজারে লগ্নির নীতি কার্যকর করতে এই মেগা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি সূত্র মারফত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা তোলার যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কেন্দ্র করেছিল, তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’ বা ডিপম (DIPAM)-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, সরকার ‘অফার ফর সেল’ বা ওএফএস (OFS)-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যই প্রায় ৩১,৫৫৮ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সংগৃহীত করেছে। স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়মানুযায়ী তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির প্রোমোটার বা প্রধান অংশীদাররা নিজেদের নির্দিষ্ট অংশ কমিয়ে লভ্যাংশ তুলে নিতে এই বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।
গত সোমবারই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এলআইসি-তে নিজেদের অংশীদারিত্ব কমানোর বড় সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পরই নন-রিটেল বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য গত মঙ্গলবার থেকে শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং সাধারণ ও রিটেল বিনিয়োগকারীদের জন্য তা বুধবার থেকে খুলে দেওয়া হয়। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮২.২২ কোটি শেয়ার সম্পূর্ণ বিক্রি করে ৩০ হাজার কোটিরও বেশি টাকা নিজেদের ঝুলিতে ভরা। পরবর্তীতে দেখা গিয়েছে যে, বাজারে এই অফার লঞ্চ হওয়ার পর রিটেল ও নন-রিটেল—উভয় শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই অত্যন্ত অভূতপূর্ব ও দারুন সাড়া পাওয়া গিয়েছে। ডিপম সচিব এ চাওলা সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, অফার চলাকালীন মাত্র দুই দিনের মধ্যেই মোট চাহিদার তুলনায় বাজারে আবেদনের সংখ্যা ছিল রেকর্ড পরিমাণে বেশি। বিনিয়োগকারীদের এই অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সম্পূর্ণ ‘গ্রিন শু অপশন’ অর্থাৎ অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রির বিশেষ সুযোগটি অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
এই বিশাল আকারের ওএফএস বা অফার ফর সেল প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সফল হওয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার এলআইসি-র ক্ষেত্রে নিজেদের মোট শেয়ারের মালিকানা বা পাবলিক ফ্লোট ১০ শতাংশে উন্নীত করতে পেরেছে। এর ফলে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সেবি (SEBI)-র নির্ধারিত ‘মিনিমাম পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং রিকোয়্যারমেন্ট’ বা ন্যূনতম জনস্বার্থ শেয়ারের শর্তটি নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই সফলভাবে পূরণ হয়ে গেল। সেবি-র নিয়ম অনুযায়ী এলআইসি-কে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডিংয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার জন্য আগামী ২০২৭ সালের ১৬ মে পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার অনেক আগেই কেন্দ্র সেই শর্ত সাফল্যের সঙ্গে হাসিল করে দেখাল। ডিপমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ অফারের আওতায় মোট ৮২,২৩,৩৩,৫৫৮টি শেয়ার সফলভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে, যা সংগৃহীত মোট অর্থের পরিমাণের বিচারে ভারতের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সর্বকালের বৃহত্তম পাবলিক অফারিং হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২২ সালের মে মাসে বহুল আলোচিত আইপিও (IPO)-র মাধ্যমে নিজেদের প্রায় ৩.৫ শতাংশ শেয়ার বাজারে বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সময় প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৯০২ টাকা থেকে ৯৮০ টাকার মধ্যে ধার্য করা হয়েছিল এবং সেই শেয়ার বিক্রি করেই সেবার প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা সফলভাবে তোলা হয়েছিল। বর্তমানের এই নতুন শেয়ার বিক্রির পর দেশের বৃহত্তম এই জীবন বিমা সংস্থায় সরকারের হাতে এখনও প্রায় ৯৬.৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা সংরক্ষিত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে সরকারের এই কৌশলগত বিনিয়োগ প্রত্যাহারের নীতি ভারতের আর্থিক বাজার ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।