ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় উত্তাল পরিস্থিতি, ৫ জন গ্রেফতারের পরই কি বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে সরকার?

ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (JSSC)-এর পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে চলা তীব্র আন্দোলনের মধ্যেই এবার আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র আলোচনার সূত্রপাত হলেই আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে না, বরং প্রধান দাবিগুলো পূরণ হলেই কেবল এই বিক্ষোভ সমাপ্ত হবে।

বুধবার গভীর রাতে ‘JPSC-JSSC রিফর্ম ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। এই সম্মেলনে ফোরামের কোর কমিটির বিশিষ্ট সদস্য রবীন্দ্র পাসওয়ান এবং পীযূষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের সামনে আন্দোলনের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ছাত্রনেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এসডিএম (SDM) এবং এসডিও (SDO)-র মাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার বার্তা পাঠানো হয়েছে। সরকারের এই প্রস্তাব পাওয়ার পর রিফর্ম ফোরামের কোর কমিটি একটি জরুরি বৈঠকে বসে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে। দীর্ঘ আলোচনার পর সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

কোর কমিটির সদস্য রবীন্দ্র পাসওয়ান গণমাধ্যমকে জানান যে, সরকার এখনও পর্যন্ত বৈঠকের কোনো আনুষ্ঠানিক তারিখ, সময় কিংবা স্থান সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি। সরকারের তরফ থেকে সময়সূচি চূড়ান্ত করা মাত্রই ফোরামের পক্ষ থেকে একটি যোগ্য প্রতিনিধি দল আলোচনার টেবিলে পাঠানো হবে। এই প্রতিনিধি দলে পাঁচজন সদস্য অংশ নেবেন বলে ঠিক হয়েছে, যদিও তাঁদের নাম এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।

তবে সরকার আলোচনার আহ্বান জানালেও আন্দোলন যে এখনই থামছে না, সেকথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ছাত্রনেতারা। পাসওয়ান জোর দিয়ে বলেন যে, ফোরাম আলোচনায় অংশ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তবে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট ও ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখতে চাওয়া হচ্ছে। যদি সরকার সমস্ত প্রধান দাবি মেনে নেয়, তবেই আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অন্যথায়, কোনো সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলন আগের মতোই নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে।

এই পুরো আন্দোলনটি যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক স্বার্থ বা উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত নয়, সেকথা পুনর্ব্যক্ত করে পীযূষ জানান যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা এবং রাজ্যের তরুণ সমাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার একমাত্র লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। সরকারের এই উদ্যোগকে তাঁরা স্বাগত জানাচ্ছেন ঠিকই, তবে আলোচনার মূল ফলাফল অবশ্যই ছাত্রসমাজের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাঁদের সাফ বার্তা—শুধুমাত্র আলোচনা শুরু করলেই আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না।

সাংবাদিক সম্মেলনে ফোরাম তাদের দীর্ঘদিনের মূল দাবিগুলি আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরে। তাদের প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো—বিগত বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জেপিএসসি এবং জেএসএসসি পরীক্ষা এবং তাতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের পুঙ্খানুপুঙ্খ সিবিআই (CBI) তদন্ত। স্থানীয় তদন্তকারী সংস্থার ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় এজেন্সির হস্তক্ষেপ অপরিহার্য বলে মনে করছে ফোরাম।

পাশাপাশি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে ১৪তম জেপিএসসি (JPSC) প্রিলিমিনারি পরীক্ষা পুরোপুরি বাতিল করে তা পুনরায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। টিডিপিএল (TDPL) সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত অন্যান্য সমস্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে ফোরামটি।

এছাড়াও তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—জেএসএসসি-সিজিএল (JSSC-CGL) এবং অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় বিদ্যমান সমস্ত অসঙ্গতি দূর করা, ওএমআর (OMR) শিট এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত ঘটনার স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধান করা এবং জেপিএসসি ও জেএসএসসির প্রশাসনিক ও কাঠামোগত আমূল সংস্কার সাধন করা। একইসঙ্গে, এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জোরালোভাবে তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে প্রশাসনিক স্তরেও তদন্তের গতি তীব্রতর হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জেপিএসসি পরীক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আরও পাঁচজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। এর ফলে এই চাঞ্চল্যকর মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘটে যাওয়া অনিয়মের সমস্ত তথ্য এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) এই গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্ত ডিজিটাল রেকর্ড, অনলাইন আবেদনের লগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে দেখছে।