“আমাদের স্নান-খাওয়া বাকি!” বাবার মৃতদেহ সামনে রেখে ভিডিও কলে ব্যস্ত তিন উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে!

মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করার জন্য নিজের জীবনের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন এক বাবা। সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে তাদের পড়িয়েছিলেন বড় পদে। কিন্তু সেই বাবারই শেষযাত্রায় পাশে রইলেন না কোন মেয়েই! সুদূর নেপাল, উত্তরপ্রদেশ এবং মুম্বই থেকে ভিডিও কলের পর্দায় বাবার শেষকৃত্য দেখে দায়িত্ব সারলেন তাঁরা। চরম অমানবিক এই ঘটনার সাক্ষী থাকল হরিয়ানার সোনিপত।

ঠিক কী ঘটেছিল?

মুম্বইয়ের বাসিন্দা এবং পেশায় প্রাক্তন বস্ত্র ব্যবসায়ী শিবচরণ রামরতন গুপ্ত গত দেড় বছর ধরে হরিয়ানার সোনিপতের পশ্চিম রামনগরে সমাজ কল্যাণ শিক্ষা সমিতি পরিচালিত একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন। স্ত্রী মীনা গুপ্তকে নিয়ে তিনি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তবে স্ত্রী আগেই মারা যান।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টা নাগাদ শিবচরণেরও মৃত্যু হয়। এর পরেই বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁর তিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সোনিপতে এসে বাবার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ব্যস্ততা ও সময়ের অভাবের অজুহাত দেখিয়ে তিন মেয়ের কেউই আসেননি। বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাসিন্দারাই শিবচরণবাবুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

ভিডিও কলে শেষ বিদায় ও অসংবেদনশীল আচরণ

বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসক আনন্দ কুমার জানান, শিবচরণের কাছে একটি মোবাইল ফোন ছিল, যার মাধ্যমে তিনি নিয়মিত মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন। মৃত্যুর প্রায় ২০ দিন আগে বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা মেয়েদের জানানো হলেও কেউ দেখতে আসেননি।

শেষ পর্যন্ত নেপালে বসবাসকারী পেশায় শিক্ষিকা বড় মেয়ে অনিতা অনলাইন মারফত ৫,১০০ টাকা পাঠিয়ে সেই অর্থ দিয়েই বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার অনুরোধ জানান। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, ভিডিও কলে শেষকৃত্য দেখার সময় এক মেয়েকে বলতে শোনা যায়— ‘আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের খেতে হবে, স্নানও করতে হবে।’ এমনকি শেষকৃত্য শেষ হওয়ার পর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকে পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিও পাঠানোরও অনুরোধ করেন তাঁরা। সোনিপতে এসে বাবার অস্থি নিয়ে যাওয়ার সময় না থাকায়, বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকেই গঙ্গায় অস্থি বিসর্জনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

উচ্চশিক্ষিত তিন কন্যা ও মর্মান্তিক পরিণতি

বৃদ্ধাশ্রম সূত্রে জানা গিয়েছে, শিবচরণবাবু তাঁর তিন মেয়েকে পড়াশোনা শেখাতে কোনো ত্রুটি রাখেননি। তাঁর সেই ত্যাগ বৃথা যায়নি—

  • বড় মেয়ে অনিতা: নেপালে থাকেন, পেশায় শিক্ষিকা।

  • দ্বিতীয় মেয়ে নিশা: থাকেন উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে।

  • ছোট মেয়ে প্রিয়া: থাকেন মুম্বইয়ে।

তিন জনেই বিবাহিতা এবং নিজ নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। অথচ বৃদ্ধ বয়সে সেই মেয়েদের কাউকেই পাশে পেলেন না বাবা। এদিকে মৃত্যুর পর শিবচরণবাবুর শেষ ইচ্ছানুসারে তাঁর চক্ষুদান করা হয়, যা অন্ধের জীবনে আলো ফিরিয়ে দিলেও সমাজের এই নির্মম ছবি ঘিরে এখন নেটদুনিয়ায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।