সরকারি অনুদানে কোটি টাকার নয়ছয়! মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চাঞ্চল্যকর CAG রিপোর্ট ফাঁস!

রাজ্যের মৎস্য দপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আর্থিক তছরুপ ও অনুদান বণ্টন নিয়ে এক অত্যন্ত বিস্ফোরক এবং চাঞ্চল্যকর অডিট রিপোর্ট পেশ করেছে কমপ্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)। CAG-এর এই ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্টের জেরে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় সরকারি সাহায্য এবং ত্রাণের টাকা বিতরণে যে ভয়াবহ গাফিলতি ও নয়ছয় ধরা পড়েছে, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
মৎস্য দপ্তর (Fishermen Assistance) সংক্রান্ত CAG-এর প্রধান পর্যবেক্ষণগুলি একে একে প্রকাশ্যে এসেছে:
প্রথমত, একই উপভোক্তাকে একাধিকবার আর্থিক সহায়তা প্রদানের মারাত্মক ত্রুটি ধরা পড়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মোট ১,১৭৪ জন উপভোক্তা হুবহু একই নাম এবং একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করে একাধিকবার সরকারি আর্থিক সহায়তা আত্মসাৎ করেছেন। এর ফলে শুধুমাত্র রাজ্যের ১৩টি ব্লকে অতিরিক্ত ৪৩.৪৯ লক্ষ টাকা বেআইনিভাবে প্রদান করা হয়েছে। CAG-এর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রাম পঞ্চায়েত ও ব্লক স্তরের সামগ্রিক যাচাই-বাছাই (Validation) ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও ঢিলেঢালা। এমনকি নামখানার বিডিও (BDO) অডিটের মুখোমুখি হয়ে এই অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে জানান যে, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে এই চরম ভুলটি ঘটে গেছে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ৪৪.৭৮ লক্ষ টাকা খরচ না হয়ে শেষ পর্যন্ত ল্যাপস করে গেছে। নামখানা ব্লকে দ্বিতীয় কিস্তির ৪৪.৭৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা ২,৭৯৯ জন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীকে দেওয়া হয়নি। ফলে নির্ধারিত ৩১ মার্চ, ২০২১ তারিখের মধ্যে সমস্ত অর্থ ল্যাপস করে যায়। পর্যাপ্ত অর্থ হাতে থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীরা সরকারি সহায়তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন বলে কড়া পর্যবেক্ষণ CAG-এর। যদিও পরবর্তী সময়ে বিডিও দাবি করেন যে, ওল্ড এজ পেনশন (Old Age Pension) এবং আমফান (Amphan) ত্রাণের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে কিছু বিভ্রান্তি তৈরির কারণেই এই টাকা নির্দিষ্ট সময়ে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।
তৃতীয়ত, ব্যর্থ ডিবিটি (DBT) লেনদেনের পরেও হাত গুটিয়ে বসে ছিল প্রশাসন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৫৭৩ জন উপভোক্তার মোট ১১.৬০ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ত্রুটির কারণে পৌঁছায়নি। ভুল ব্যাঙ্ক তথ্য সংশোধন করে সেই টাকা সঠিক উপভোক্তার কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্লক প্রশাসন কোনো রকম কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলস্বরূপ, ১১.৬০ লক্ষ টাকা বিতরণ না হয়ে সম্পূর্ণ ল্যাপস করে যায়। পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে উপভোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু অডিটের সময় তার সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা নথি দেখাতে পারেনি প্রশাসন।
পাশাপাশি, প্রাণিসম্পদ দপ্তর (Animal Resources) সংক্রান্ত CAG-এর পর্যবেক্ষণগুলিও সমানভাবে উদ্বেগজনক:
প্রথমত, সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে অডিট প্রক্রিয়ায় অসহযোগিতা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। উপভোক্তাদের মূল তালিকায় সঠিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং ফটো আইডি (Photo ID)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলির বালাই ছিল না। এর ফলে কোনো ধরনের ডুপ্লিকেট বা অতিরিক্ত অর্থপ্রদান হয়েছে কি না, তা যাচাই করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। CAG জানিয়েছে যে, ডিবিটি (DBT)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া অর্থপ্রদানের নির্ভুলতা কোনোভাবেই নিশ্চিত করা যায়নি।
দ্বিতীয়ত, মোট ৩১৬টি ক্ষেত্রে অদ্ভুতভাবে একই মোবাইল নম্বর ব্যবহারের তথ্য সামনে এসেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ২,৩৮০ জন উপভোক্তার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে দেখা গেছে যে, ৩১৬টি ভিন্ন ক্ষেত্রে একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এই সন্দেহজনক লেনদেনের মোট পরিমাণ প্রায় ০.১৭ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা। CAG-এর মতে, এই ধরনের অসঙ্গতি আসল উপভোক্তা শনাক্তকরণের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
তৃতীয়ত, একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বরে একাধিক ভিন্ন উপভোক্তার টাকা পাঠানোর তথ্য মিলেছে। অন্তত ১৮ জন উপভোক্তার ক্ষেত্রে হুবহু একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর পাওয়া গেছে। এই সমস্ত লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ০.০২ কোটি অর্থাৎ প্রায় ২ লক্ষ টাকা। অডিটের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এর জেরে কমপক্ষে ৩০,০০০ টাকার অতিরিক্ত বা দ্বৈত অর্থপ্রদানের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
চতুর্থত, অতিরিক্ত অর্থপ্রদান হয়নি—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, দুটি আলাদা ধাপে আলাদা ধরনের ক্ষতির জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়েছিল, তবুও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে অতিরিক্ত বা ডাবল পেমেন্ট হয়নি—এমন কোনো দালিলিক নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয় বলেই স্পষ্ট মন্তব্য করেছে CAG। পরবর্তী সময়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, সমগ্র ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।