“প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও রিমুভ কাণ্ড!”-মেটাকে ৩ দিনের সময়সীমা, কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফেসবুক ভিডিও কয়েক ঘণ্টার জন্য সরিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা (Meta)-র বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিল সংসদের তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি। কমিটির স্পষ্ট বার্তা, মেটার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মার্ক জাকারবার্গকে এই ঘটনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। শুধু তাই নয়, শুধুমাত্র দুঃখপ্রকাশ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির গতানুগতিক ব্যাখ্যা দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সংস্থাকে আগামী তিন দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ ঘটনার দায় কার, তা নির্ধারণ করে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় ভারতে মেটার ‘সেফ হারবার সুরক্ষা’ (Safe Harbour) বা আইনি সুরক্ষা প্রত্যাহারের বড়সড় সুপারিশ করা হতে পারে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান তথা বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে বৈঠকের পর স্পষ্টভাবে জানান যে, এটি কেবল কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটির বিষয় নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। ১.৪ বিলিয়ন মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধির সরকারি বার্তা এ ভাবে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?

গত ২৩ জুলাই রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পোস্ট করা একটি ফেসবুক সেলফি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই গোটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সেই ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী NEET প্রশ্নফাঁস ইস্যু নিয়ে দেশের ছাত্র-ছাত্রী ও যুবসমাজকে বার্তা দেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনার আশ্বাস জানান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত—প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সেই ভিডিওটি ফেসবুক থেকে উধাও ছিল। পরবর্তীতে মেটার পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে জানানো হয় যে, এটি একটি ‘অপারেশনাল বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি’ ছিল এবং ভুলবশতই ভিডিওটি রিমুভ হয়েছিল। এর পর সেটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

সংসদীয় বৈঠকে মেটাকে যে সমস্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়

এই ঘটনার জেরে শুধু মেটা নয়, গুগল, ইউটিউব, এক্স (Twitter) এবং স্ন্যাপচ্যাট-এর প্রতিনিধি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও মেটি-র (MeitY) শীর্ষ আধিকারিকদের তলব করেছিল সংসদীয় কমিটি। মেটার প্রতিনিধিদের সামনে একাধিক কঠিন প্রশ্ন রাখা হয়:

  • প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওটি সরানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসলে কে নিয়েছিল?

  • ঠিক কোন প্রযুক্তিগত বা অভ্যন্তরীণ কারণে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হলো?

  • সাধারণ বা আপত্তিকর ভুয়ো কনটেন্ট অনেক সময় প্ল্যাটফর্মে অবাধে ঘুরে বেড়ালেও, কেন সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ভিডিও সরিয়ে ফেলা হলো?

  • ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে মেটা কী সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করবে?

  • প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব অ্যালগরিদম ঠিক কী উপায়ে রাজনৈতিক বা গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্টের দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ করে?

সূত্রের খবর, বৈঠকে মেটার প্রতিনিধিরা ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ার কথা বললেও কমিটি তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। কে এর জন্য দায়ী এবং তার বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার লিখিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ‘সেফ হারবার সুরক্ষা’?

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ৭৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে ‘সেফ হারবার সুরক্ষা’ বা আইনি অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে যে সমস্ত কনটেন্ট পোস্ট করেন, তার জন্য সরাসরি ওই সংস্থাকে আইনি দায় নিতে হয় না। কিন্তু যদি কোনো সংস্থা দেশের আইন বা সরকারি নির্দেশিকা মানতে চরম ব্যর্থ হয়, তবে সরকার চাইলে এই সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নিতে পারে। তেমনটা হলে ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা যেকোনো ভুলের বা আপত্তিকর কনটেন্টের জন্য সরাসরি আইনি খাঁড়ার মুখে পড়তে হবে মেটার মতো সংস্থাকে।

রাজনৈতিক মহলে তরজা

এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে চরম চর্চা। একদিকে যখন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে ও কেন্দ্র সরকার মেটার এই কার্যপদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করে জাকারবার্গের ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন, তখন উল্টো ছবি দেখা গেছে তৃণমূল কংগ্রেসে। দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র প্রকাশ্যেই মেটার পাশে দাঁড়িয়ে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে লেখেন, “হ্যালো মার্ক, দয়া করে ভয় পেয়ো না বা কারও কাছে ক্ষমা চাইতে যেও না। প্রতি মুহূর্তে সরকার ভারতীয় নাগরিকদের ব্ল্যাকমেল করে চলেছে…।” একটি ভিডিও ভুলবশত কয়েক ঘণ্টার জন্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য এত বড় পদক্ষেপ অপ্রয়োজনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই বিতর্কের জল কতদূর গড়ায় এবং মেটা আগামী তিন দিনের মধ্যে কী সাফাই দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল ও দেশের প্রযুক্তি বিশ্ব।