রক্তদাতাদের উপহারের লোভ দেখিয়ে অবৈধ ব্যবসা! সাড়ে তিন কোটি টাকার প্লাজমা কেলেঙ্কারিতে তলব হাজরার ব্লাড ব্যাঙ্ককে

রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বেআইনিভাবে ভিনরাজ্যে জীবনদায়ী রক্ত ও প্লাজমা পাচারের গুরুতর অভিযোগে লাইসেন্স বাতিল করা হলো দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের অত্যন্ত পরিচিত ‘হেলথ পয়েন্ট ব্লাড ব্যাঙ্ক’-এর। স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিল বা এসবিটিসি (SBTC)-র জোরালো সুপারিশের ভিত্তিতে এই কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল। শুধু তাই নয়, কোটি কোটি টাকার এই অবৈধ ও রমরমা কারবারের গভীরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত ব্লাড ব্যাংকগুলির বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যা নিয়ে গোটা চিকিৎসা মহলে তীব্র শোরগোল পড়ে গেছে।

প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে যে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ভিনরাজ্যে প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকার পিআরবিসি (PRBC) বা প্যাকড রেড ব্লাড সেল এবং ৪ কোটি ১৫ লক্ষ টাকার এফএফপি (FFP) বা ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা বেআইনিভাবে বিক্রি করা হয়েছে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকার লোহিত কণিকা ও মূল্যবান প্লাজমা কোনো রকম সরকারি অনুমোদন বা নজরদারি ছাড়া রাজ্যের বাইরে পাচার হয়েছে। এই চরম অনিয়মের জেরে ইতিমধ্যেই ওই ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির ক্যাম্প থেকে রক্ত সংগ্রহের উপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে স্বাস্থ্য দফতর এবং হেলথ পয়েন্ট ব্লাড ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে দুটি সহ মোট পাঁচটি গুরুতর এফআইআর রুজু করা হয়েছে।

অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার প্লাজমা বিক্রির চাঞ্চল্যকর অভিযোগে দক্ষিণ কলকাতারই হাজরার ‘পিপলস ব্লাড ব্যাঙ্ক’-এর কর্তাব্যক্তিদের তলব করেছে স্বাস্থ্যভবন। গত সোমবার রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের বিশেষ আধিকারিকরা ওই ব্লাড ব্যাঙ্কে আচমকা একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিযান চালান। তল্লাশির সময় অফিসাররা দেখতে পান যে, একটি সাধারণ ছোট ফ্রিজারের ভেতরে গাদাগাদি করে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বেআইনিভাবে ঠাসা রয়েছে শয়ে শয়ে ইউনিট রক্ত ও প্লাজমা। এখানেই শেষ নয়, ব্লাড ব্যাঙ্কের অন্দরে পড়ে থাকতে দেখা যায় বিভিন্ন শাসকদলের প্রভাবশালী নেতাদের নামে ‘ফ্রি’ লেখা একাধিক রবার স্ট্যাম্পও, যা গোটা ঘটনাকে এক অন্য মাত্রার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় ৫৭০টি বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করে অবিশ্বাস্যভাবে ৪২ হাজার ৮৪২ প্যাকেট রক্ত সংগ্রহ করেছিল এই হাজরার ব্লাড ব্যাঙ্কটি, যা সাধারণ অঞ্চলের স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। নিয়মকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সাড়ে তিনশো মিলিলিটারের নির্ধারিত প্যাকেটে সংগ্রহ করা হচ্ছিল পাঁচশো মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত। মূলত অতিরিক্ত প্লাজমা বিক্রির লোভেই বিভিন্ন মনভোলানো উপহারের টোপ দিয়ে সাধারণ ও সরলমনা রক্তদাতাদের কাছ থেকে জোর করে বা অতিরিক্ত রক্ত আদায় করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।