কিশোর কুমারের গান ভেবে যেগুলি শুনেছেন, সেগুলি আসলে কার গাওয়া? ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে ফাঁস হল অজানা সত্য!

সঙ্গীতজগতের অমর সুরকার কিশোর কুমারের বর্ণাঢ্য জীবন ও তাঁর অসামান্য অবদানের কথা উঠলেই সকলের আগে মনে পড়ে তাঁর জাদুকরী কণ্ঠের কথা। তবে তাঁর সংগীতযাত্রার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গল্পও আজও অনুরাগীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে তাঁর সুযোগ্য পুত্র তথা বিশিষ্ট গায়ক অমিত কুমারের গানের কেরিয়ার গড়ে তোলার পেছনে প্রখ্যাত ও বহুমুখী প্রতিভাধর গায়ক কিশোর কুমারের অবদান ছিল একেবারে অনস্বীকার্য। যদিও ঘরোয়া জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও কড়া শিক্ষক। অমিত কুমার একটু বেসুরো গাইলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা ধরে ফেলতেন। আবার অমিতের কোনো গান খুব ভালো লাগলেও তিনি মুখে কখনো তার প্রশংসা করতেন না, কেবল একটি গম্ভীর ‘হুঁ’ শব্দ করে চুপ করে থাকতেন।

আসলে, কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের বড় ছেলে অমিত কুমারের গায়কী এবং কণ্ঠস্বরের গঠন তাঁর বাবার সঙ্গে এতটাই মিলে যেত যে শ্রোতাদের পক্ষে অনেক সময় তফাত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াত। এর ফলে অমিতের গাওয়া বেশ কিছু সুপারহিট গান আজও অনেকেই ভুলবশত কিশোর কুমারের গাওয়া গান বলে মনে করেন। কিংবদন্তি কিশোর কুমারের ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে আজ একবার ফিরে দেখা যাক সেই সমস্ত অমর সৃষ্টিগুলিকে, যেগুলি আজও শুনলে মনে হয় খোদ কিশোর কুমারেরই গাওয়া, অথচ সেই সব গানের নেপথ্যে কণ্ঠের আসল অধিকারী ছিলেন তাঁরই পুত্র অমিত কুমার।

১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তরুণ মজুমদার পরিচালিত কালজয়ী রোমান্টিক সিনেমা ‘বালিকা বধূ’-র হিন্দি সংস্করণের কথা উঠলেই প্রথমেই মনে আসে ‘বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায়’ গানটির কথা। শচীন পিলগাঁওকর এবং রজনী শর্মা অভিনীত এই ছবির গানটি লিখেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার আনন্দ বক্সী এবং সুর দিয়েছিলেন রাহুল দেব বর্মন। গানটি গেয়েছিলেন অমিত কুমার, কিন্তু প্রথমদিকে এই গান শুনে বহু মানুষ ভেবেছিলেন যে এতে কণ্ঠ দিয়েছেন স্বয়ং কিশোর কুমার। এটি অমিত কুমারের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক। একইভাবে, ১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাহুল রাওয়াইল পরিচালিত ‘লাভ স্টোরি’ সিনেমার জন্যও এক অন্য ইতিহাস তৈরি হয়েছিল। প্রযোজক রাজেন্দ্র কুমার চেয়েছিলেন তাঁর পুরোনো বন্ধু কিশোর কুমার সমস্ত গান গাইবেন, কিন্তু অতীতের এক মনোমালিন্যের কারণে কিশোরদা সাফ জানিয়ে দেন যে তিনি গাইবেন না, তবে তাঁর ছেলে অমিত এই ছবির জন্য একদম উপযুক্ত। এরপর পুরো অ্যালবামের দায়িত্ব আসে অমিতের কাঁধে।

এছাড়াও, ‘জিবা’ (১৯৮৬) সিনেমার বিখ্যাত রোমান্টিক গান ‘রোজ রোজ আঁখো তলে’ পাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে এক দারুণ মজার ঘটনা। সুরকার আর. ডি. বর্মন প্রথমে গানটি শুধু আশা ভোঁসলের একক কণ্ঠ হিসেবে ভেবেছিলেন, কিন্তু অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের জেদের কারণে পুরুষ কণ্ঠের প্রয়োজন পড়ে। পরবর্তীতে প্রযোজকের স্বল্প বাজেটের কারণে কিশোর কুমারের বদলে সেই গান চলে আসে অমিত কুমারের ঝুলিতে। অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালের ‘বাটো বাতো মে’ ছবির জনপ্রিয় গান ‘না বোলে তুম না ম্যায়নে কুছ কাহা’-তে অমিত কুমারকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল সুরকার রাজেশ রোশনের জহুরীর চোখ। আমোল পালেরকের সাধারণ ও লাজুক প্রেমিকের ইমেজের সঙ্গে অমিত কুমারের সতেজ ও ক্যাজুয়াল কণ্ঠ নিখুঁত ম্যাজিক তৈরি করেছিল।

পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে কিশোর কুমারের চিরবিদায়ের পর বলিউড যখন একজন এনার্জেটিক প্লেব্যাক গায়কের সন্ধান করছিল, তখন অনিল কাপুরের ড্যাশিং ও চঞ্চল ইমেজের আদর্শ কণ্ঠ হয়ে ওঠেন অমিত কুমার। ‘তেজাব’ সিনেমার ‘কেহ দো কে তুম হো মেরি বরণা’ থেকে শুরু করে ‘লখন’, ‘খেল’ কিংবা ‘জামাই রাজা’-র মতো ছবিতে অনিল কাপুরের নেপথ্য কণ্ঠ হিসেবে অমিত কুমার এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিলেন। বাবার কঠোর শাসন ও আশীর্বাদকে সম্বল করে নিজের প্রতিভায় তৈরি করা অমিত কুমারের এই সোনালী গানগুলি আজও ভারতীয় সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।