মাদ্রাসার ডিগ্রি কি আর বৈধ নয়? কামিল ও ফাজিল পড়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কড়া পদক্ষেপ যোগী সরকারের!

উত্তরপ্রদেশের মাদ্রাসাগুলিতে প্রথাগত উচ্চশিক্ষা প্রদান সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বর্তমানে গোটা রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এতদিন ধরে মাদ্রাসায় বিএ এবং এমএ-এর সমতুল্য বলে বিবেচিত উচ্চশিক্ষা প্রদান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে আগামী দিনে মাদ্রাসাগুলির পঠনপাঠন কেবল দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকারি সূত্রে প্রকাশ, গত বছরের অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ই নভেম্বরের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশ এবং তার আইনি ব্যাখ্যাকে ভিত্তি করেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে প্রশাসন।

উল্লেখ্য, এর আগে সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের দেওয়া সেই রায়টি খারিজ করে দিয়েছিল যেখানে মাদ্রাসা আইনকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। শীর্ষ আদালত উত্তরপ্রদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখলেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেছিল। আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে, মাদ্রাসা বোর্ডগুলি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি-র নির্ধারিত কঠোর প্রবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা প্রদান করতে পারবে না। সহজ কথায়, কামিল এবং ফাজিল ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে এই নির্দেশ সরাসরি প্রযোজ্য হবে।

পুরো ব্যাপারটি আসলে কী?
উত্তরপ্রদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজ্যের অসংখ্য মাদ্রাসায় দীর্ঘকাল ধরে ‘কামিল’ এবং ‘ফাজিল’ নামক বিশেষ কোর্স পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে এই উচ্চমানের ডিগ্রিগুলির আইনি বৈধতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সময়ে সময়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং নির্দিষ্ট কিছু সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের জন্য প্রধানত এই ডিগ্রিগুলির ওপর ভরসা করে থাকে। ঐতিহ্যগত দিক থেকে বিচার করলে—
• কামিল: এই কোর্সটিকে প্রথাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে বিএ বা স্নাতক ডিগ্রির সমতুল্য বলে গণ্য করা হয়।
• ফাজিল: এই ডিগ্রিটিকে সাধারণ শিক্ষার এমএ বা স্নাতকোত্তর স্তরের সমতুল্য বলে বিবেচনা করা হয়।

এই সমস্ত কোর্সগুলোর সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমে মূলত ইসলাম ধর্ম শিক্ষা, আরবি ভাষা, ফার্সি এবং আনুষঙ্গিক বেশ কিছু ইসলামি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। অতীতেও বিভিন্ন আইনি ও সামাজিক বিতর্কে এই যুক্তি বারবার জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে যে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মূল এবং আদি উদ্দেশ্য হলো ইসলামিক ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রচার করা, প্রথাগত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বহুমুখী ডিগ্রি প্রদান করা নয়। সেই যুক্তির ভিত্তিতেই মাদ্রাসা বোর্ডের মাধ্যমে ফাজিল ও কামিল ডিগ্রি বিতরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিএ-এমএ পড়ানো বন্ধ করার প্রয়োজন কেন পড়ল?
যেকোনো ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রদান এবং আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর এখতিয়ারভুক্ত। যদি কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় না হয় কিংবা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অধিভুক্ত না থাকে, তবে তাদের দ্বারা বিএ বা এমএ-র সমতুল্য ডিগ্রি প্রদান করা হলে তা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেকোনো মুহূর্তে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কামিল ও ফাজিল কোর্সকে ঘিরে বর্তমান আইনি ও প্রশাসনিক বিতর্কের মূল ভিত্তিই হলো এই সাংবিধানিক ও কাঠামোগত প্রশ্ন। আর ঠিক এই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট তার গত ৫ই নভেম্বরের রায়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, মাদ্রাসাগুলি ইউজিসি-র সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলীর বাইরে গিয়ে কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা অর্থাৎ কামিল ও ফাজিল ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে না।

পুরোনো ডিগ্রিগুলোর কী হবে?
সরকার যদি শেষ পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের মাদ্রাসায় বিএ এবং এমএ স্তরের উচ্চশিক্ষা প্রদান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তার মানে এই নয় যে অতীতে ইতিমধ্যে প্রাপ্ত সমস্ত পুরোনো ডিগ্রি রাতারাতি বাতিল হয়ে যাবে। এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির ওপর। সরকারের এই নতুন নির্দেশিকাটি কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রযোজ্য হবে নাকি পূর্বে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের দেওয়া ডিগ্রিগুলোর ওপরও এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেকোনো কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পূর্বে সরকার সাধারণত ইতিমধ্যে কোর্সে ভর্তি হয়ে থাকা বা ডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে থাকে।

এর ফলে শিক্ষার্থীদের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
১. কামিল এবং ফাজিল কোর্সে নতুন করে কোনো ছাত্রছাত্রীকে আর ভর্তি নেওয়া হবে না।
২. মাদ্রাসার কৃতি ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য কঠোরভাবে মূলধারার প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর নির্ভর করতে হবে।
৩. মাদ্রাসাগুলির মূল ও পবিত্র লক্ষ্য শুধুমাত্র ধর্মীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে।
৪. বর্তমান ট্রানজিশন ফেজে থাকা শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে আলাদা কোনো বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।

কতজন শিক্ষার্থী এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?
গত বছর ৫ই নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট যখন উত্তরপ্রদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কামিল অর্থাৎ স্নাতক-স্তরের এবং ফাজিল অর্থাৎ স্নাতকোত্তর-স্তরের ডিগ্রি প্রদান প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক বা নিয়মের বাইরে বলে ঘোষণা করেছিল, তখন গোটা রাজ্যজুড়ে প্রায় ৩২,০০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী এই বিশেষ কোর্সগুলিতে পড়াশোনার জন্য পঞ্জীকৃত বা ভর্তি ছিলেন। আদালতের এই আইনি মারপ্যাঁচ এবং সরকারি কঠোর পদক্ষেপে বর্তমানে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেকেরই মূল্যবান একটি শিক্ষাবর্ষ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন বাধ্য হয়েই তাদের উচ্চশিক্ষার বিকল্প ও নতুন পথ খুঁজতে হচ্ছে।

মাদ্রাসায় শিক্ষার বর্তমান পরিকাঠামো কী?
উত্তরপ্রদেশের মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষার স্তরগুলিকে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে:
• প্রাথমিক বা তাহাত-তানিয়া: এই স্তরে মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হয়।
• ফৌকানিয়া: এটি জুনিয়র স্কুল স্তরের সমতুল্য, যেখানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়।
• মুন্সি বা মৌলভী: মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা যখন দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়, তখন তাদের এই নামে অভিহিত করা হয়।
• আলিম: মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্বাদশ শ্রেণির উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনাকে ‘আলিম’ বলা হয়ে থাকে।
• কামিল ও ফাজিল: স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উচ্চশিক্ষা স্তরে মাদ্রাসায় যথাক্রমে কামিল ও ফাজিল পড়ানো হয়ে থাকে।

উত্তরপ্রদেশ সরকার বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরে নানাবিধ পরিবর্তন এনে চলেছে। অতীতে মাদ্রাসাগুলির ওপর একটি ব্যাপক ও বিস্তারিত সমীক্ষা চালানো হয়েছিল এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অস্বীকৃত ও অবৈধ মাদ্রাসাগুলিকে চিহ্নিত করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি, মাদ্রাসাগুলির সিলেবাসে আধুনিক ও সাধারণ বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবিও উঠেছিল। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আইনি ভূমিকা নিয়ে বিগত দিনে দীর্ঘ আইনি লড়াইও তৈরি হয়েছিল। এখন এই কামিল এবং ফাজিল পাঠ্যক্রম বাতিল বা সীমাবদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি সেই ধারাবাহিক প্রশাসনিক সংস্কারেরই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।