খালি হাতে ফেরেন না কেউ! কৌশিকী অমাবস্যার জাদুকরী রাতে কীভাবে মিলবে মা তারার কৃপা?

কৌশিকী অমাবস্যা (Kaushiki Amavasya) বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বীরভূমের পবিত্রপীঠ তারাপীঠের রূপালী আলয় ও অগণিত ভক্তের ঢল। ভাদ্র মাসের এই বিশেষ অমাবস্যার তিথির জন্য সারা বছর ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন দেশ-বিদেশের সাধক ও পুণ্যার্থীরা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও তন্ত্র সাধনার ইতিহাসে এই রাতের মাহাত্ম্য অপরিসীম। বিশ্বাস করা হয়, কৌশিকী অমাবস্যার এই পবিত্র রাতে মা তারার চরণে মন থেকে আপ্রাণ কিছু প্রার্থনা করলে ভক্তদের খালি হাতে ফিরতে হয় না। মহাশক্তিপীঠ তারাপীঠের এই মহা তিথি ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও কোটি কোটি মানুষের মনে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। ভক্তদের প্রধান প্রশ্ন হলো—চলতি ২০২৬ সালে ঠিক কবে এবং কখন পড়েছে এই অমাবস্যা এবং মা তারাকে পুজো দেওয়ার সঠিক লগ্ন বা সময়টাই বা কখন?
পঞ্জিকা এবং জ্যোতিষ গণনার নির্ভুল তথ্য অনুযায়ী, এ বছর অত্যন্ত মহিমান্বিত কৌশিকী অমাবস্যা পড়েছে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। আর এই পুণ্য তিথি কার্যকর থাকবে পরের দিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত। ভক্তদের সুবিধার্থে ঘড়ির কাঁটা ধরে সঠিক সময়টি জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। পঞ্জিকা মতে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টা ১১ মিনিটে অমাবস্যা তিথি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। আর এই বিশেষ তিথি শেষ হবে ১১ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। অর্থাৎ ভক্তরা মা তারার আরাধনা, বিশেষ পুজো ও তান্ত্রিক সাধনার জন্য এই নির্দিষ্ট সময়টুকুই নিখুঁতভাবে পাবেন। এই সময়ের মধ্যেই তারাপীঠের মূল মন্দিরে মা তারাকে রাজবেশে সাজিয়ে পূজা অর্চনা সম্পন্ন করা হবে, যা দেখার জন্য দূর-দূরান্তর থেকে ছুটে আসেন পুণ্যার্থীরা।
দেবী পার্বতীর নাম কেন ‘কৌশিকী’ হলো, তার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গল্প। প্রাচীনকালে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই অত্যাচারী অসুর ব্রহ্মা দেবের কাছ থেকে অমরত্বের বর পেয়েছিল যে, কোনো সাধারণ মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া নারী তাদের হত্যা করতে পারবে না। অর্থাৎ কোনো ‘অযোনিসম্ভূতা’ মহাশক্তি ছাড়া তাদের বধ করা অসম্ভব ছিল। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, সেই সময় দেবী পার্বতীর গায়ের রঙ কিছুটা শ্যামলা বা কালো ছিল বলে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে ভালোবেসে ‘কালিকা’ বলে সম্বোধন করতেন। এক দিন সবার সামনে ওই নামে ডাকায় দেবীর মনে তীব্র অভিমান হয়। তিনি মানস সরোবরের তীরে গিয়ে অত্যন্ত কঠোর তপস্যা শুরু করেন। দীর্ঘ তপস্যা শেষে সরোবরের পবিত্র জলে স্নান করতেই দেবীর শরীরের সমস্ত কালো কোশ বা সেল ঝরে পড়ে। এর পরেই দেবী পার্বতীর গায়ের রং পূর্ণিমার চাঁদের মতো ফর্সা ও অপরূপ সুন্দর হয়ে ওঠে।
দেবী পার্বতীর শরীর থেকে ঝরে পড়া সেই কালো কোশ থেকেই জন্ম নেন তেজস্বী আরেক নতুন দেবী। কোশ থেকে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলেই তাঁর নাম রাখা হয় ‘কৌশিকী’। পরবর্তীতে এই দেবীই ভাদ্র মাসের বিশেষ অমাবস্যা তিথিতে দুই পরাক্রমশালী অসুর শুম্ভ ও নিশুম্ভকে নির্মমভাবে বধ করে স্বর্গ ও মর্ত্যের দেবতাদের রক্ষা করেছিলেন। অন্যদিকে, তন্ত্র সাধনার জগতে কৌশিকী অমাবস্যার এই রাতকে ‘তারা রাত্রি’ বলেও অভিহিত করা হয়। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ রাতে ভালো ও মন্দ—উভয় শক্তির পথই সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে। বাংলার সর্বকালের অন্যতম মহান তান্ত্রিক সাধক বামাক্ষ্যাপা এই কৌশিকী অমাবস্যার পবিত্র রাতেই তারাপীঠের মহাশ্মশানে দীর্ঘ সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন এবং স্বচক্ষে মা তারার রূপ দর্শন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক দিন থেকেই প্রতি বছর এই বিশেষ তিথিতে তারাপীঠ মন্দির চত্বরে মহাসমারোহে উৎসব পালিত হয় এবং মা তারাকে রাজবেশে ভূষিত করে পুজো করা হয়।