‘জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে!’ যন্তরমন্তরের আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রকে নোটিশ পাঠিয়ে কী নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত?

দেশের রাজধানী নতুন দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক যন্তরমন্তর চত্বর কি আর প্রতিবাদের জন্য উপযুক্ত স্থান নয়? এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকে সামনে রেখে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সোমবার এই মামলার প্রাথমিক শুনানির পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। ওই জনস্বার্থ মামলায় জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে যে, যন্তরমন্তরের মতো জনবহুল এলাকায় লাগাতার প্রতিবাদ-বিক্ষোভের জেরে স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা প্রতিদিন মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। পাশাপাশি, এর ফলে রাজধানীর জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের চেইনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছেন সতীশ চাঁদ কৌশিক নামের এক ব্যক্তি। তাঁর দাখিল করা এই বিশেষ আবেদনের ওপর ভিত্তি করে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ বেঞ্চ কেন্দ্র সরকারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষগুলির বরাবর নোটিশ জারি করেছে। শুনানিকালে আদালত দেশের প্রবীণ সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, তিনি যেন অবিলম্বে উত্থাপিত এই সংবেদনশীল বিষয়গুলি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও মতামত সংগ্রহ করে আদালতকে অবহিত করেন।
আবেদনে মূলত বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য দিল্লি শহরের অন্য কোনো বিকল্প ও উপযুক্ত ব্যবস্থার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত নিজের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, আবেদনটিতে ওই সংবেদনশীল এলাকায় সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত, প্রবেশ ও প্রস্থান এবং চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সলিসিটর জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আবেদনে যে মূল বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো—যাতায়াতের মারাত্মক সমস্যার কারণে যন্তরমন্তর চত্বরটি এখন আর এ ধরনের বড় ধরনের বিক্ষোভের জন্য আদৌ উপযুক্ত স্থান নয়। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি সামগ্রী সরবরাহের মতো সংবেদনশীল বিষয়টিও জড়িত রয়েছে। আমার মতে এই পয়েন্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ… অনুগ্রহ করে আপনি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা গ্রহণ করুন।”
শুনানির একেবারে শেষ পর্যায়ে আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতের গোচরে একটি আসন্ন রাজনৈতিক মিছিলের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান যে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে একটি টাউন হলের আয়োজন করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে একটি বড় মিছিল করার পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খল ঘটনাগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে, গত ২০ জুলাইয়ের ঘটনার মতো পরিস্থিতি যাতে আবার নতুন করে না ঘটে, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। তবে এই নির্দিষ্ট বক্তব্যের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দেয় যে, তারা প্রস্তাবিত রাজনৈতিক মিছিল বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করতে ইচ্ছুক নয়। প্রধান বিচারপতি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মন্তব্য করেন, “প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভালোভাবেই জানে যে কীভাবে এই ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে হয়। যদি তারা তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে অব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসুক। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে তারা এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলে নেবে।” এই মামলাটি যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের পক্ষ থেকে একটি পৃথক তালিকাভুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের রাজনৈতিক রাজধানী দিল্লির এই যন্তরমন্তর চত্বরেই সম্প্রতি নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। বিশেষ করে গত ২০ জুলাই সংসদের অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে যে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। সেই সময় বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছিল, যার জেরে একাধিক বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষ গুরুতরভাবে আহত হন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল পড়ে যায়। এখন যন্তরমন্তরে বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ এবং বিকল্প স্থানের দাবি সংক্রান্ত এই আইনি লড়াই আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।