মা-বাবার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস! উপকার বেশি নাকি ক্ষতি?

আমাদের দেশে বহু সন্তানই বড় হওয়ার পর জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এসে প্রথমবারের মতো নিজের আলাদা ঘর, নতুন বিছানা, নিজস্ব বইয়ের তাক বা আলমারি পান। নতুন এই ব্যক্তিগত পরিসর বা স্পেস যেমন একদিকে স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে আসে, তেমনই অনেকের কাছেই এটি মানসিকভাবে এক অদ্ভুত ও নতুন অভিজ্ঞতা। দিনের বেলা নিজের পছন্দমতো ঘর সাজাতে বেশ ভালো লাগলেও, রাত নামলেই যেন চারপাশ এক গভীর শূন্যতায় ঘিরে ধরে। এতদিন মা-বাবার পাশে, একই ঘর বা একই বিছানায় ঘুমানোর অভ্যস্ততা কেটে হঠাৎ একা ঘুমাতে গেলে অস্বস্তি, বুক ধড়ফড় করা কিংবা ঘুম না আসার মতো সমস্যা দেখা দেয়। উপমহাদেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে এই অনুভূতি অত্যন্ত পরিচিত।

কারণ ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বিছানা বা একই ঘরে ঘুমানো— যাকে বলা হয় কো-স্লিপিং (Co-sleeping)— তা দক্ষিণ এশিয়ার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের এক অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি। তবে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, এই অভ্যাস কি সন্তানের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, নাকি পরবর্তী জীবনে স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার পথে বড় কোনো বাধা সৃষ্টি করে?

কো-স্লিপিং আসলে কী?

সহজ কথায়, কো-স্লিপিং বলতে বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় কিংবা একই ঘরে সন্তানের ঘুমানোর অভ্যাসকে বোঝায়। কখনও একই বিছানায়, আবার কখনও একই ঘরে আলাদা খাটে ঘুমানোও এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি বহু বছরের পারিবারিক রীতি। অনেক পরিবারে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক বা বড় হয়ে যাওয়ার পরও একই ঘরে ঘুমানোর এই অভ্যাস বজায় থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কো-স্লিপিং কেবল ঘুমানোর একটি পদ্ধতি নয়; এটি অনেক পরিবারের আবেগ, নিরাপত্তা এবং গভীর যত্নের প্রতীক। ছোট শিশুরা বাবা-মায়ের কাছাকাছি থাকলে মানসিকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ অনুভব করে। আমাদের সমাজে এই অভ্যাসকে প্যারেন্টিং-এর একটি স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবেই দেখা হয়, যেখানে শিশুকে একা ঘুমাতে শেখানোর চেয়ে তার তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

পশ্চিমা বিশ্বেও কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?

একসময় ইউরোপ ও আমেরিকায় জন্মলগ্ন থেকেই শিশুদের আলাদা কট (Cot) বা নার্সারিতে আলাদা শোয়ার ঘরে অভ্যস্ত করার প্রচলন ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেখানে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘অ্যাটাচমেন্ট প্যারেন্টিং’ (Attachment Parenting), যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কো-স্লিপিং।

অনেক নতুন পশ্চিমা বাবা-মাও এখন মনে করেন, একই ঘরে বা একই বিছানায় ঘুমালে শিশুকে রাতে স্তন্যপান করানো বা পরিচর্যা করা সহজ হয়। পাশাপাশি, শিশু ও অভিভাবকের মধ্যে গভীর মানসিক বন্ধন তৈরি হয়। দিনের ব্যস্ততার পর রাতে একসঙ্গে গল্প করা, খুনসুটি বা আদর— এই মুহূর্তগুলো পারিবারিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।

কো-স্লিপিংয়ের ইতিবাচক দিক

  • নিরাপত্তাবোধ: গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কো-স্লিপিং তাদের মনে গভীর নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে। শিশুরা রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মা-বাবাকে পাশে পেলে দ্রুত আশ্বস্ত হয়, ফলে তাদের ভয় বা উদ্বেগ কমে যায়।

  • আবেগীয় বিকাশ: বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক সংযোগ শিশুর আবেগীয় বিকাশে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

  • পারিবারিক যোগাযোগ: একই ঘরে ঘুমানোর ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও নৈকট্য বাড়ে, যার ফলে শিশুরা নিজেদের কখনই একা বা অবহেলিত মনে করে না।

কোথায় তৈরি হয় সমস্যা?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরেও যদি সন্তান প্রতিটি ছোটোখাটো বিষয়ে বাবা-মায়ের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল থাকে, তবে তার নিজস্ব আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে উঠতে দেরি হতে পারে। নিজের ঘরে একা ঘুমাতে না পারা, নতুন কোনো পরিবেশে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করা কিংবা জীবনের বড় কোনো সিদ্ধান্ত একা নিতে দ্বিধায় ভোগা— এসবের পেছনে দীর্ঘদিনের এই কো-স্লিপিংয়ের পরোক্ষ প্রভাব থাকতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কো-স্লিপিং জন্মগতভাবেই ক্ষতিকর। বরং বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সন্তানের বয়স, তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এবং পরিবার কীভাবে ধাপে ধাপে তাকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে তার ওপর।

কখন ও কীভাবে আলাদা ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তাকে নিজের ঘরে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। তবে এক ধাক্কায় হঠাৎ করে আলাদা না করে কিছু সহজ কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:

  • শোয়ার ঘরে নিয়মিত গল্প বলার অভ্যাস করা।

  • ঘরে মৃদু আলোর নাইট লাইট (Night light) ব্যবহার করা।

  • কিছুদিন একই ঘরে আলাদা বিছানায় শোয়ানোর অভ্যস্ততা তৈরি করার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা অনেক সহজ হয়।