বীরভূমে পাহাড়প্রমাণ নগদ ও সোনার খনি! টুলু মণ্ডলের আত্মীয় গ্রেফতার হতেই ফাঁস কোটি কোটি টাকার রহস্য!

বীরভূমের অপরাধ জগতে ফের এক ঐতিহাসিক এবং চাঞ্চল্যকর মোড়। দীর্ঘ তল্লাশি অভিযান শেষে অবশেষে গ্রেফতার করা হয়েছে জেলার কুখ্যাত পাথর মাফিয়া তথা একদা বেতাজ বাদশা মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মীনার মণ্ডল এবং তাঁর ছেলেকে। কঠোর এবং দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার মহম্মদবাজারের গোপন ডেরা থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার সিউড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়। এই আকস্মিক ও চাঞ্চল্যকর অভিযানে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতি এবং প্রশাসনিক মহলে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৯ জুলাই ভোররাত থেকেই মহম্মদবাজারে পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মীনার মণ্ডলের বাসভবনে অভিযান চালায় বীরভূম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ ও চৌকস দল। দীর্ঘ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের পর এই দোতলা বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় চোখ কপালে তোলার মতো নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি ওজনের খাঁটি সোনার বাট। বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এই বিশাল পরিমাণ সোনার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকারও অধিক।

দীর্ঘ রাতভর পুলিশের তত্ত্বাবধানে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় ওই বাড়িটিতেই সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল উদ্ধার হওয়া নগদ টাকা এবং সোনা। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার সকালে সশস্ত্র পুলিশ ও সেন্ট্রাল ফোর্সের জওয়ানদের কঠোর ঘেরাটোপে সমস্ত অর্থ ও সোনা সিউড়িতে নিয়ে আসা হয়। এই সম্পূর্ণ ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ মীনার মণ্ডল এবং তাঁর পুত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করেছে। তবে কোটি কোটি টাকার এই বিশাল সাম্রাজ্যের মূল পান্ডা তথা টুলু মণ্ডল এখনও পর্যন্ত পলাতক রয়েছে। তাঁর সন্ধানে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সাঁড়াশি তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন।

বীরভূম জেলা পুলিশ সুপার বিদিতরাজ বন্দেশ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ধৃত মীনার মণ্ডল স্বীকার করে নিয়েছেন এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং সোনা সম্পূর্ণভাবেই টুলু মণ্ডলের। পুলিশ সুপার আরও জানান, এই ঘটনায় মোট তিনজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার নেপথ্যে থাকা সমস্ত যোগসূত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে আরও চাঞ্চল্যকর আপডেট সামনে আনা হবে।

উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার উৎস ঠিক কী, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি নতুন মামলা রুজু করেছে পুলিশ। তদন্তকারী দল সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া নগদ টাকাগুলো ঘরের বিভিন্ন কোণায় মোট ২০টি আলাদা ব্যাগে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। টাকার সঠিক ও নিখুঁত পরিমাণ গণনা করার জন্য পুলিশকে একসঙ্গে পাঁচটি আধুনিক টাকা গোনার মেশিন ব্যবহার করতে হয়েছে। গোনার পর সেই টাকাগুলো কয়েকটি বিশাল ট্যাঙ্কে ভরে সম্পূর্ণ সিল করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি, উদ্ধার হওয়া সোনার বাটগুলো আসল না নকল, তা নিশ্চিত করতে তৎক্ষণাৎ স্বর্ণকার ডেকে এনে পরীক্ষাও করানো হয়।

উল্লেখ্য, বীরভূম জেলার মহম্মদবাজার, নলহাটি এবং সংলগ্ন দেউচা-পাচামি অঞ্চলের বেআইনি পাথর ব্যবসার জগতের অবিসংবাদিত সম্রাট ছিল এই টুলু মণ্ডল। পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি তার নেতৃত্বে রমরমা অবৈধ বালির কারবারও পরিচালিত হতো। এমনকি এর আগে কুখ্যাত কয়লা পাচার কাণ্ডেও এই মাফিয়ার নাম জোরালোভাবে জড়িয়েছিল। সব মিলিয়ে অপরাধের অন্ধকার জগতে ত্রাস সৃষ্টি করা টুলু মণ্ডলের এই বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের শেকড় ঠিক কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা এখন খতিয়ে দেখছে বীরভূম জেলা পুলিশ। টুলুর অন্য কোনো গোপন ডেরায় আরও সম্পত্তি বা টাকা লুকানো রয়েছে কি না, সেদিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে।