এআই জুয়ায় ধস নামতেই ঘুরে দাঁড়াল ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত! টিসিএস-ইনফোসিস-উইপ্রোর শেয়ারে জোরালো ঊর্ধ্বমুখী ঝড়

চলতি বছরের দীর্ঘ সময় ধরে নানাবিধ অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকার পর অবশেষে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের শেয়ারবাজার। বুধবারের শেয়ার বাজারেও সেই শক্তপোক্ত ঊর্ধ্বমুখী ধারা দারুণভাবে বজায় থাকতে দেখা গেছে। এদিন দেশের প্রথম সারির আইটি জায়ান্ট যেমন টিসিএস (TCS), ইনফোসিস (Infosys), এইচসিএলটেক (HCLTech), উইপ্রো (Wipro), টেক মাহিন্দ্রা (Tech Mahindra) এবং কোফোর্জ (Coforge)-এর শেয়ারে একলাফে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত দুর্দান্ত উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। অথচ একই নির্দিষ্ট সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ বাড়ায় আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে সেমিকন্ডাক্টর এবং এআই-সংক্রান্ত শেয়ারে মারাত্মক বিক্রির চাপ ও ধস দেখা গেছে।

বুধবারের ইন্ট্রাডে লেনদেনে ভারতীয় আইটি শেয়ারে প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে টিসিএস-এর শেয়ার প্রায় ৩.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৪৭৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে ইনফোসিস-এর শেয়ার ৪.১ শতাংশ চাঙ্গা হয়ে ১১৫২ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি এইচসিএলটেক প্রায় ২.৩ শতাংশ এবং উইপ্রো ২.২ শতাংশ মুনাফা অর্জন করেছে। মাঝারি বা মিড-ক্যাপ আইটি সংস্থাগুলির মধ্যে কোফোর্জ তাদের প্রথম ত্রৈমাসিকের শক্তিশালী ও তাক লাগানো আর্থিক ফলাফলের পর আরও ৫ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়েছে। এছাড়া পারসিস্টেন্ট সিস্টেমস-এর শেয়ারও ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-তে যে হাজার হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার প্রকৃত আর্থিক লাভ কবে নাগাদ মিলবে। বিশিষ্ট বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা কাজ করছিল, এখন তা অনেকটাই শীতল হতে শুরু করেছে। প্রযুক্তি-নির্ভর নাসডাক ১০০ (Nasdaq 100)-এর সাম্প্রতিক পতন মূলত এই পরিবর্তিত মানসিকতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন হিসাব কষতে শুরু করেছেন যে, বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির এআই খাতে করা বিপুল বিনিয়োগ থেকে বাস্তবে কত দ্রুত রিটার্ন আসবে।

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে চীনের সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। চ্যাংজিন মেমোরি টেকনোলজিস (CXMT)-এর শেয়ার বাজারে আত্মপ্রকাশের পর ব্যাপক উত্থান এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত একটি সংস্থার ডিইউভি লিথোগ্রাফি (DUV Lithography) প্রযুক্তিতে অভাবনীয় অগ্রগতির খবর বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নতুন ও তীব্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই সমস্ত কারণে এশিয়ার অন্যান্য শেয়ারবাজারেও চরম চাপ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি (KOSPI) সূচক বড় ধরনের ওঠানামার মুখে পড়েছে, স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্স-এর শেয়ারে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে, এবং জাপানের নিকেই সূচকও অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে থেকে লেনদেন শেষ করেছে।

তাহলে হঠাৎ করে এমনকী ঘটে গেল যার জেরে ভারতীয় আইটি শেয়ারে এই রমরমা ভাব? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্রোকারেজ সংস্থা জেফারিজ (Jefferies)-এর সাম্প্রতিক এক বিশদ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FPI) মধ্যে ভারতীয় শেয়ারবাজারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ফের অত্যন্ত ইতিবাচক হয়ে উঠছে। এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আশাবাদ বা হাইপ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ বাজার ছেড়ে তুলনামূলকভাবে কম দামে থাকা আকর্ষণীয় ভারতীয় আইটি শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন। জেফারিজের মতে, চলতি বছরে ভারতীয় আইটি সূচক প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। বিশেষ করে টিসিএস, ইনফোসিস, এইচসিএলটেক এবং উইপ্রো তাদের গত দুই বছরের সর্বোচ্চ মূল্যের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নিচে লেনদেন করছে। ফলে মূল্যায়নের দিক থেকে এই সমস্ত স্টক এখন বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।