সামান্য পেটের ব্যথার ইঞ্জেকশন আর তাতেই কেটে বাদ দিতে হল হাত! কোন চিকিৎসায় এল এই চরম সর্বনাশ?

সামান্য পেটে ব্যথা ও বমির মতো সাধারণ উপসর্গের চিকিৎসা করাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের ডান হাতটাই চিরতরে হারাতে হলো এক দরিদ্র গৃহবধূকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের নাড়াজোল গ্রামীণ হাসপাতালে চিকিৎসার পর ওই মহিলার ডান হাতে অসহ্য যন্ত্রণা ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অস্ত্রোপচার করে তাঁর ডান হাত কনুই থেকে কেটে বাদ দিতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। এই মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার পুলিশের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণের জোরালো দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরও পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট তলব করেছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা গিয়েছে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার নাড়াজোল গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা পুতুল দোলই গত ৬ জুলাই গভীর রাতে হঠাৎ করেই তীব্র পেটে ব্যথা এবং ঘন ঘন বমির সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে পরিবারের লোকজন তাঁকে দ্রুত রাত প্রায় ১১টা নাগাদ স্থানীয় নাড়াজোল গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সেই সময় হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নার্স তাঁকে নির্দিষ্ট কিছু ইনজেকশন ও ওষুধ প্রয়োগ করেন। এর ফলে পেটের সমস্যা কিছুটা উপশম হলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ডান হাতে ভয়ংকর ও অসহনীয় যন্ত্রণা শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে শুরু করে। এর পর প্রথমে তাঁকে মেদিনীপুর এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতার এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরিবারের দাবি, রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও শরীরের ভেতরে সংক্রমণ ও জটিলতা এতটাই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত গত ১৫ জুলাই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার করে তাঁর ডান হাত কনুইয়ের নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হয়।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী পুতুল দেবীর স্বামী কিংকর দোলই স্থানীয় দাসপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। দোলই পরিবার অত্যন্ত অস্বচ্ছল ও প্রান্তিক অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কঠোর পরিশ্রমী দিনমজুর হিসেবে কাজ করে বহু কষ্টে সংসার চালাতেন। শরীরের একটি হাত চিরতরে হারিয়ে পুতুল দেবী আজ পুরোপুরি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অস্ত্রোপচারের গভীর ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকিয়ে ওঠেনি, আর এর পাশাপাশি তিনি চরম মানসিক অবসাদে ভেঙে পড়েছেন। বর্তমানে তাঁর স্বামীকেই দিনরাত তাঁর দেখাশোনা করতে হচ্ছে। এর ফলে স্বামী নিয়মিত কাজে যেতে না পারায় ওই হতদরিদ্র পরিবারটি বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক অনটন ও অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে যে, সেই রাতে নাড়াজোল গ্রামীণ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ডিউটিতে ছিলেন ডা. সুদীপ্ত নস্কর। তাঁর প্রেসক্রিপশনে তিনটি সাধারণ ইনজেকশন ও কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। ঠিক কোথায় এবং কার ভুলে এই ভয়ংকর পরিণতি হলো—ওষুধের ভুল প্রয়োগে, নার্সের ইনজেকশন দেওয়ার ত্রুটিতে, নাকি রোগীর পূর্ব-বিদ্যমান কোনো শারীরিক জটিলতার কারণে—তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে এবং নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

যদিও এই চাঞ্চল্যকর প্রসঙ্গে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. সৌম্য শঙ্কর সারেঙ্গী ক্যামেরার সামনে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বিষয়টি জানার পরপরই সংশ্লিষ্ট ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কাছ থেকে দ্রুত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। সেই রিপোর্ট হাতে এসে পৌঁছলেই ঘটনার নেপথ্যের আসল সত্য প্রকাশ্যে আসবে। অন্যদিকে, এলাকার বিধায়ক সুকান্ত দোলই জানিয়েছেন যে তিনি শুরু থেকেই ওই দুঃখী পরিবারের পাশে রয়েছেন এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্য দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কোথায় চিকিৎসার ত্রুটি হয়েছিল, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার সমস্ত রকম উদ্যোগ নেওয়া হবে। সামান্য পেটের সাধারণ চিকিৎসার জেরে কীভাবে একজন সাধারণ গৃহবধূকে জীবনের এমন চরম মূল্য চুকাতে হলো, এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রয়েছে শোকার্ত পরিবার ও এলাকাবাসী।