২০২১ ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলায় বড় ধাক্কা! গুরাপের তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধান সহ ৩ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে ফের এক চাঞ্চল্যকর ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের খবর সামনে এল। বহুল আলোচিত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসা মামলায় হুগলি জেলার গুরাপ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দণ্ডীচরণ ঘোষ সহ মোট তিন জন সক্রিয় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীকে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় গুরাপ থানার পুলিশ। বিগত কয়েক বছর ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝে এই গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করে গোটা জেলাজুড়ে এক বিরাট শোরগোল শুরু হয়েছে। ধৃত বাকি দুই অভিযুক্ত হলেন শুভঙ্কর ঘোষ এবং শেখ আসরাফউদ্দিন, যাঁরা প্রত্যেকেই স্থানীয় তৃণমূল স্তরের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে গুরাপ এলাকার প্রভাবশালী বিজেপি নেতা সৌদীপ ঘোষ এবং তাঁর পরিবারের উপর নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় তৃণমূলের কতিপয় উগ্র নেতা-কর্মী বিজেপি নেতা সৌদীপের বাড়িতে চড়াও হয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং সর্বস্ব লুট করে। শুধু তাই নয়, মারধরের পাশাপাশি ওই পরিবারটিকে লাগাতার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য হন এবং এমনকি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য কোনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হয়। এই গোটা তাণ্ডবলীলা এবং সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করার পেছনে মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে গুরাপ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দণ্ডীচরণ ঘোষ এবং তাঁর অনুগামীদের সরাসরি মদদ ছিল বলেই জোরালো অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভয়ের চোটে মুখ খুলতে না পারলেও সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলানোর পর পুলিশে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন নিগৃহীত বিজেপি নেতা। অভিযোগ পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। দ্রুত তদন্ত শুরু করে গুরাপ থানার একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত প্রধান সহ তিনজনকে পাকড়াও করে। পুলিশ সূত্রে খবর, বুধবারই ধৃত তিনজনকেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে স্থানীয় মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে।
এই প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হুগলি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সম্পাদক তথা আক্রান্ত নেতা সৌদীপ ঘোষ অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “ধৃত ব্যক্তিরা ২০২১ সালে এলাকায় চরম সন্ত্রাস কায়েম করেছিল। আমাদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়, এমনকী আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। বাড়ির দরজায় লোক দাঁড় করিয়ে রাখা হতো যাতে আমরা বের হতে না পারি। আমার মায়ের মাথা পর্যন্ত ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় রাজ্যজুড়ে এত বেশি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল যে আমরা পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহসটুকুও পাইনি। তবে আজ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এখন মানুষের মনে ভয় কেটে গেছে এবং আইনের প্রতি ভরসা ফিরে এসেছে। তাই আমরা সাহস করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি এবং লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বহু পুরানো এই হিংসার ঘটনায় বর্তমান সময়ে এসে পঞ্চায়েত প্রধানের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে আইনি হাত কতদূর লম্বা হতে পারে। এই ঘটনার জেরে হুগলি জেলার গ্রামীণ রাজনীতিতে শাসক দলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ নতুন করে সামনে চলে এসেছে। এখন আদালতের পরবর্তী নির্দেশের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমস্ত পক্ষ।